TwitterFacebook

অপরাধ ২৩-হত্যা ধর্ষণ অপহরণ নির্যাতন ধর্মান্তর ॥ অভিযুক্ত সাকা

Published/Broadcast by :
Date : Thursday, 5 April 2012
Author :
Published at (city) :
Country concerned :
Regarding alleged perpetrator :
Keywords : ,
Language :
Entry Type : News, Uncategorized
Source : http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2012-04-05&ni=92215
Content :

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মান্তরে বাধ্য করাসহ ২৩ অপরাধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। বুধবার বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, ২৯ এপ্রিল থেকে রাষ্ট্রপক্ষ সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করবে। এর মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন করা হলো। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
বুধবার আদেশে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিম বলেন, প্রসিকিউশন সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে যেসব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছে, তাতে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ)(সি)(১)(জি)(এইচ) ধারা অনুযায়ী অপরাধ করেছেন।
বিচারপতি নিজামুল হক এরপর জনাকীর্ণ আদালতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অভিযোগ পড়ে শোনান এবং জানতে চান- তিনি অভিযোগগুলো শুনতে এবং বুঝতে পেরেছেন কি-না। জবাবে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, তিনি শুনতেও পাননি, বুঝতেও পারেননি। এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বলে, যেহেতু আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়েছে, সেহেতু তিনি এ বিষয়ে অবগত বটে ধরে নেয়া হলো। বিচারপতি নিজামুল হক এরপর সাকা চৌধুরীর কাছে জানতে চান- তিনি দোষী, না নির্দোষ। জবাবে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাল্টা প্রশ্ন করেন- কেন? কোন অপরাধে? এ নিয়ে কথপোকথনের একপর্যায়ে তিনি বলেন, যেহেতু তিনি কোন লিখিত অভিযোগ পাননি, সেহেতু এ বিষয়ে তিনি কিছু বলবেন না।
ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর প্রসিকিউটর সৈয়দ জেয়াদ-আল-মালুম সাংবাদিকদের বলেন, বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের দিন ছিল। ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ, ১৯৭৩-এর ৩(২) এর ধারায় তার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের সহায়তা অপহরণ, অগ্নিসংযোগ দেশান্তরী করা ও ধর্মান্তরিত করাসহ ২৫টি অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। সেটার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল ২৩টি ঘটনার বিরুদ্ধে ৩(২) (এ)(স)(জি)(এইচ) অভিযোগ গঠন করেছে। তিনটি ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ২৯ এপ্রিল থেকে সূচনা বক্তব্য শুরু হবে।
অভিযোগ গঠনের আগে-পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বেশ কয়েকবার ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন। এমনকি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের উদেশে তিনি বলেছেন, ‘আমাকে আইন শেখাতে আসবেন না।’ ট্রাইব্যুনাল চলাকালে সাকা চৌধুরী আইনের তোয়াক্কা না করে নিজের করা আবেদনের শুনানি নিজেই করার দাবি জানান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক প্রসঙ্গক্রমে সম্প্রতি সাকার স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরীর করা মন্তব্যকে আদালত অবমাননাকর বলে উল্লেখ করেন। ট্রাইব্যুনাল বিচারের নামে নাটক ও প্রহসন করছে বলে অভিযোগ করে ফারহাত বলেছিলেন, ‘তাকে (সাকা) ফাঁসি দেয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া আছে। তাই এসব না করে পল্টন ময়দানে নিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হোক।’
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা হতেই পারে। তবে আদালত অবমাননাকর কোন কথা বলা ঠিক নয়। উল্লেখ্য, সাকার পক্ষে তার আইনজীবী জামিন আবেদন করলে তা উত্থাপিত হয়নি (নট টু প্লেস) মর্মে খারিজ করে দেয় আদালত। এছাড়া যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে রিভিউ পিটিশন (পুনর্বিবেচনা আবেদন) করেন। ১২ এপ্রিল রিভিউ পিটিশনের শুনানি করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এদিন মোট চারটি আবেদন করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
২৩টি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে তা নিচে দেয়া হলো :-
অভিযোগ-১
৪ বা ৫ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার পর মতিলাল চৌধুরী, অরুন চৌধুরী, যোগেশ চন্দ্র দে, ও পরিতোষ দাস, পাচক সুনীল প্রমুখ বন্ধুগণ একত্রিত হয়ে শহীদ মতিলাল চৌধুরীর চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালি থানাধীন রামজন লেনের বাসভবনে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনারত ছিলেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী আব্দুস সেবাহান এ বাড়িতে ঢুকে তাদের দেখে সঙ্গে সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে গুডসহিলে খবর দেয়। তার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই দুই ট্রাক পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে উক্ত সোবহান বাসাটি ঘেরাও করে ফেলে এবং তাদের অপহরণ করে ট্রাকে তুলে গুডসহিলে নিয়ে যায়। পাচক সুনীলকে আটক ও অপহরণ করে আর্মির ট্রাকে তুলে গুডসহিলে নিয়ে যায়। পাচক বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ হওয়ায় তাকে গুডসহিলের নির্যাতন কেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাকি ৬ জনকে আটক করা হয়। ছাড়া পাওয়ার কিছুক্ষণ পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী উক্ত আব্দুস সোবহান মতিলাল চৌধুরীর বাসার সামনে সুনীলকে দেখতে পেয়ে সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হওয়ায় প্রমাণ বিনষ্ট করার জন্য তালোয়ার দিয়ে কোপাতে শুরু করে। কিন্তু অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে আটক করে রাখা সেই ৬ ব্যক্তির আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। যা থেকে নিশ্চিত ধরে নেয়া যায় যে, তাদের সেখানেই হত্যা করা হয়েছে।
অভিযোগ-২
১৩ এপ্রিল এ সমস্ত হত্যাকা- সংঘটিত হয়। সকাল আনুমানিক সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান হানাদার দখলদার বাহিনীর একদল সদস্য গহিরা গ্রামে হিন্দুঅধ্যুষিত পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। অভিযান চালিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দুদের ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে তাদের হত্যা করে। সেখানে যাদের গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেন, পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা, দুলাল শর্মা, আহতদের মধ্যে মাখন লাল শর্মা মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়ে মারাত্মক জখম হয়ে ৩-৪ দিন পর মারা যান। জয়ন্ত কুমার শর্মা পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে কয়েক বছর পর মারা যান।
অভিযোগ -৩
১৩ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীকে নিয়ে ঘটনাস্থল গহিরা শ্রী কু-েশ্বরী ঔষধালয়ে আসেন। ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক শ্রী নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানী সেনারা ৫-৭ মিনিট কথাবার্তা বলে চলে যায়। চলে যাওয়ার আনুমানিক ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পুনরায় পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে কু-েশ্বরী ভবনে প্রবেশ করে। ঐ সময় শ্রী নূতন চন্দ্র সিংহ বাড়ির ভিতরে মন্দিরে প্রার্থনারত ছিলেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে মন্দিরের ভিতর থেকে টেনেহিঁচড়ে সামনে নিয়ে আসেন এবং উপস্থিত পাকিস্তানী সেনাদের উদ্দেশে বলে যে, একে হত্যা করার জন্য বাবার নির্দেশ আছে। অতঃপর নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করার জন্য আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী উপস্থিত পাকিস্তানী সেনা সদস্যদের নির্দেশ প্রদান করে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী সেনারা কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে ব্রাশফায়ার করে। গুলিবিদ্ধ নূতন চন্দ্র সিংহ মাটিতে পড়ে ছটফট করা অবস্থায় আসামি সাকা চৌধুরী নিজে তাঁকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সশস্ত্র অভিযান শেষে বেলা আনুমানিক ১০টা সোয়া দশটার দিকে পাকিস্তানী সেনা সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
অভিযোগ-৪
১৩ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সকাল ১০.৩০ থেকে ১১.৩০ পর্যন্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্থানীয় সহযোগীদেরসহ পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দুঅধ্যুষিত জগৎমল্লপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। ঘটনার দিন সাকা চৌধুরীর দুই সহযোগী আব্দুল মাবুদ ও অপর একজন জগৎমল্লপাড়ায় সেখানকার হিন্দু নর-নারীদের সবাইকে কথিত এক শান্তি মিটিংয়ে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তাদের কাথায় বিশ্বাস করে এলাকাবাসী সবাই কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় একে একে জড়ো হতে থাকে। তখন তাদের একত্রিত করে বসানো হয়। অতঃপর সাকার উপস্থিতে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এখানে গুলিতে ৩২ নারী-পুরুষ মারা যান।
যাদের গুলি করে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে ছিলেন, তেজেন্দ্র লাল নন্দী, সমির কান্তি চৌধুরী, অশোক চৌধুরী, সীতাংশু বিমল চৌধুরী, প্রেমাংশু বিমল চৌধুরী, কিরণ বিকাশ চৌধুরী, সুরেন্দ্র বিজয় চৌধুরী, চারুবালা চৌধুরানী, নিরুবালা চৌধুরানী, প্রভাতি চৌধুরী, রাজলক্ষ্মী চৌধুরানী, কুসুমবালা চৌধুরানী, যতীন্দ্র লাল সরকার, হীরেন্দ্র লাল সরকার, প্রভাতি সরকার, দেবেন্দ্র লাল চৌধুরী, রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী, অজিত কুমার চৌধুরী, পরিতোষ চৌধুরী, ভবতোষ চৌধুরী, গোপাল চৌধুরী, রানীবালা চৌধুরানী, মঞ্জুর চৌধুরী, ঝিনু চৌধুরী, রুনু চৌধুরী, দেবু চৌধুরী, স্বপন চৌধুরী, ফণীভূষণ চৌধুরী, মধুসূদন চৌধুরী, বিপিন চৌধুরী, কামিনি রুদ্র, অনন্ত বালা পাল (নিরুবালা)।
অভিযোগ-৫
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল বেলা আনুমানিক একটার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কতিপয় অনুসারীদের নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে হামলা চালায়। সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার পূর্বে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে সুলতানপুর গ্রামের বণিক পাড়ায় লোকজনদের নিকট পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর প্রশংসা করে কাউকে বাড়ি না ছাড়ার জন্য প্ররোচনা চালায়। স্থানীয় লোকজন পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন না করতে পেরে নারী-শিশুদের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়। সেনা সদস্যরা বণিকপাড়ায় প্রবেশ করে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে এলাকার নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনিল বরণ ধরকে একত্রিত করে গুলি করে হত্যা করে। হত্যাকা- শেষে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী তাদের অনুসারী ও পাকিস্তানী সেনা সদস্যদের নিয়ে আনুমানিক আধঘণ্টার মধ্যে সুলতানপুর গ্রাম ত্যাগ করে।
অভিযোগ-৬
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে ৫টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। উক্ত পাড়ায় পাকিস্তানী সেনা ও তাদের দোসরার এলাকার হিন্দু নর-নারীদের স্থানীয় ক্ষিতীশ মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে শান্তি মিটিংয়ের নামে একত্রিত করে। অতঃপর সাকা চৌধুরীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে পাকিস্তানী সেনারা নিরীহ নিরস্ত্র ও একত্রে বসানো হিন্দু নর-নারীদের ওপর ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।
এদের মধ্যে রয়েছেন চন্দ্র কুমার পাল, তারা চরণ পাল, বাবুল মালী, গোপাল মালী, সন্তোষ মালী, বলরাম মালী, অভিমুন্য পাল, পাখী বালা পাল, বেনী মাধব পাল, ধীরেন্দ্র পাল, বিরজা বালা পাল, হিমাংশু পাল, সতীশ চন্দ্র, সুপ্রিয় পাল, দুর্গাচরণ পাল, শান্তিবালা পাল, নিকুঞ্জ বিহারী পাল, বলরাম পাল, শ্রীরাম পাল, ফনীন্দ্র পাল, তারাপদ পাল, পুনিল বিহারী পাল, নিকুঞ্জ পাল, নকৃল পাল, হেমন্ত কুমার পাল, স্বপন কুমার সেন, ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী, নির্মল চৌধুরী, মধুসূদন চৌধুরী, শান্তিপদ চৌধুরী, নিরঞ্জন চৌধুরী, বাবুল চৌধুরী, কৃষ্ণ চৌধুরী, রঞ্জিত কুমার রুদ্র. মনীন্দ্র চৌধুরী, জ্যোৎনা বালা চৌধুরী, প্রীতি কনা চৌধুরী, মনিকুন্তলা চৌধুরী, কৃষ্ণা রানী চৌধুরী, মিলন দে, শ্রীপতি চৌধুরী, উপেন্দ্র লাল ঘোষ, মনোরঞ্জন ঘোষ, প্রতিমা দাস, জুনু ঘোষ, বাদল চৌধুরীÑ এই ৫০ জনের লাশ গ্রামবাসী শনাক্ত করে। বাকি ১৯/২০ জনের লাশ গ্রামবাসী শনাক্ত করতে পারেনি। কারণ তাঁরা ছিলেন বহিরাগত। পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে ঊনসত্তরপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।
অভিযোগ-৭
১৪ এপ্রিল ১৯৭১ সাল। দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানী সেনাসদস্য রাউজান পৌরসভা এলাকায় সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে প্রবেশ করে। সতীশ চন্দ্র পালিত ঐ সময় ঘরের ভেতর থেকে রেবিয়ে এসে পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে ইংরেজীতে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলে যে, তাকে মেরে ফেলতে হবে।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যরা সাত শ’ চন্দ্র পালিতকে ঘরের ভেতর যেতে বলে। তিনি পেছন ফিরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করাকালে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার লাশ কাঁথাকাপড় দিয়ে মুড়িয়ে তাতে পাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ সৈন্যরা সবাই একসঙ্গে চলে যায়।
অভিযোগ-৮
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ১১টা। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফ্ফর আহম্মদ তার পুত্র শেখ আলমগীরসহ তার পরিবারের কতিপয় সদস্য প্রাইভেটকারযোগে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসার পথে হাটহাজারী থানাধীন খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি তিন রাস্তার মোড়ে সকাল অনুমান ১১টার দিকে পৌঁছামাত্র আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পাকিস্তানী দখলদার সৈন্যরা তাদের প্রাইভেট গাড়িটি অবরোধ করে শেখ মোজাফ্ফর আহম্মেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আটক করে স্থানীয় আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
পরবর্তীতে তাদের আত্মীয়স্বজন পরিচিত সূত্রে চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানাধীন রহমতগঞ্জ গুড হিলে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে শেখ মোজাফ্ফর আহমদ এবং তার পুত্র শেখ আলমগীরকে মুক্ত করার অনুরোধ করেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী বিষয়টি দেখবেন বলে জানান এবং আলোচনার এক পর্যায়ে এও বলেন যে, ‘বিষয়টি সালাউদ্দিন কাদেরের ব্যাপার। দেখি কি করা যায়।’ ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কালক্ষেপণ করতে থাকেন। ফলে শেখ মোজাফ্ফর আহম্মদ ও শেখ আলমগীরকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ-৯
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে এপ্রিলের মাঝামাঝি দুটি বড় ট্রাকযোগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালীতে আসে। একখানা জীপে করে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একই সঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানাধীন সিও অফিসস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে আসে। ঐ দুটি ট্রাক একই থানাধীন কদুরখিল গ্রামে যাওয়ার সময় মুন্সীর হাটের শান্তিদেবকে ধরে নিয়ে আসে। তাকে থানার উত্তর পাশে বানিকপাড়ায় গুলি করে হত্যা করে। অনতিদূরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। শান্তির দেবের লাশ ঐ সময় কে বা কারা নিয়ে যায়। ঐ সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও রাজাকারের সদস্যরা বণিকপাড়ার রামবাবুর ঘরবাড়ি, কদুরখিল হিন্দুপাড়া লুটপাট করে।
অভিযোগ-১০
১৩ এপ্রিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীরা সাকা চৌধুরীর সঙ্গে ডাবুয়া গ্রামে মানিক ধরের বাড়িতে এসে তার জীপ গাড়ি ও ধান ভাঙ্গার কল লুট করে নিয়ে যায়। মানিক ধর সাকা চৌধুরীসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে থানায় মামলা দায়ের করে।
অভিযোগ-১১
১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল সকালবেলা কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ও আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী মুসলিম লীগের লোকজন তাদের নির্দেশেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুসলিম লীগ সমর্থক রাজাকার খয়রাতি, জহির, এবং জসিজকে নিয়ে একযোগে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ যোগসাজশে ও চক্রান্তে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানাধীন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা শাকপুরা গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের হত্যা করা হয়। শাকপুরা প্রাথমিক স্কুলের নিকটবর্তী জঙ্গলে ও ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য মানুষকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে নির্বিচারে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে নিহতদের মধ্যে ৫২ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়। কিন্তু মোহরা, কালুরঘাট, নোয়াখালী ও কুমিল্লা থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা অনেকেই ঐ এলাকায় আশ্রয় নেন যাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া আক্রমণকারীরা শাকপুরা গ্রামের দারোগার মাঠে নিয়ে নিকুঞ্জ চৌধুরী, অরবিন্দ রায়, ফণীন্দ্র শীল, প্রাণহরি শীল, নিকুঞ্জ শীল, ধনঞ্জয় চৌধুরী, নগেন্দ্র শীল, প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার সুখেন্দু বিকাশ নাগ, বিশ্বেশ্বর আচার্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়। উপরোক্ত হত্যাকা- ছাড়াও শাকপুরা এলাকায় যুদ্ধকালীন বিভিন্ন সময়ে আরও তিন শতাধিক লোককে হত্যা করা হয় যাদের সেখানে মাটিচাপা দিয়ে সমাধিস্থ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে শাকপুরা প্রাইমারি স্কুলের নিকটবর্তী পুকুরপাড়ে রাস্তার পাশে শাকপুরা গ্রামের নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং তার সহযোগীদের হাতে নিহত ৭৬ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এরা হলো- ফয়েজ আহম্মদ, জালাল আহম্মদ, হাবিলদার সেকেন্দার আলী, আমীর হামজা, আবুল হাশিম, আব্দুল মতিন, হাবিবুর রহমান (লেদু), আহাম্মদ ছফা, অরবিন্দ রায়, নিকুঞ্জ রায়, ধীরেন্দ্র লাল দে, ফণীন্দ্র লাল শীল, নিকুঞ্জ শীল, প্রাণহরি শীল, নগেন্দ্র লাল শীল, দেবেশ চৌধুরী, গৌরাঙ্গ প্রসাদ চৌধুরী, বিশু চৌধুরী, গৌরাঙ্গ নন্দী, তপন নন্দী, ডাক্তার মধুসূদন চৌধুরী, রঘুনন্দন চৌধুরী, নিরঞ্জন চৌধুরী, সুখেন্দ্র বিকাশ নাগ, রবীন্দ্র লাল চৌধুরী, উপেন্দ্র লাল চৌধুরী, নিরঞ্জন চৌধুরী, বিশ্বেশ্বর আচার্য, দয়াল হরি আচার্য, কামিনী শুক্ল দাস, যোগেন্দ্র লাল শুক্ল দাস, দেবেন্দ্র শর্মা, যতীন্দ্র লাল সেন, ধুর্জ্জটি বড়ুয়া, প-িত রমেশচন্দ্র বড়ুয়া, রতন চৌধুরী, প্রিয়তোষ চৌধুরী, চন্দন চৌধুরী, নিরজ্ঞন চৌধুরী, হরিরঞ্জন চৌধুরী, দীলিপ চৌধুরী, মিলন বিশ্বাস, সুবল বিশ্বাস, ব্রজেন্দ্র লাল চৌধুরী, গোপাল চৌধুরী, ধীরেন্দ্র চৌধুরী, রমণী চৌধুরী, গৌরাঙ্গ চৌধুরী, দয়াল নাথ, রাখাল সিংহ, মনমোহন চক্রবর্তী, শশাঙ্ক ঘোষ, সুখেন্দ্র বিকাশ চৌধুরী, ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী, বরদা চরন চৌধুরী, মণীন্দ্র লাল খাস্তগীর, বঙ্কিমচন্দ্র সেন, সাধন ঘোষ, গৌরাঙ্গ চৌধুরী, ধনঞ্জয় কৈবত্য, নলিনী কৈবত্য, সমিত রঞ্জন বড়ুয়া, নারায়ণ চৌধুরী, যতীন্দ্র লাল দাস, মণীন্দ্র লাল দাস, রমেশ চৌধুরী, ডাক্তার সুখেন্দু বিকাশ দত্ত, প্রদীপ কান্তি দাস, রায় মোহন চৌধুরী, হরিপদ চৌধুরী, অমল চৌধুরী, ডাক্তার পূর্ণ চরণ, মদন কুমার দাস।
অভিযোগ-১২
৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় সাকার উপস্থিতিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাউজান থানায় জ্যোতিমল্ল গ্রামে গুলি করে বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী রাখাল, বিভূতি ভূষণ চৌধুরী, হীরেন্দ্র লাল চৌধুরীকে হত্যা করে।
অভিযোগ-১৩
১৯৭১ সালের ১৫ মে বাদ মাগরিব অর্থাৎ সন্ধ্যার সময় আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে তাদের সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্য অলি আহম্মদ (মইন্যাপাড়া, উত্তর হালিশহর, উত্তর গেট এলাকায় রায় মোল্লার জামাতা) পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে ঘাসিমাঝির পার এলাকায় উপস্থিত হয়ে এলাকার লোকজন আওয়ামী লীগের সমর্থক হওয়ায় রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত তাদের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ যোগসাজশে ও চক্রান্তে আক্রমণ করে লুটপাট, ৬ জনকে গুলি করে হত্যা, ২ জনকে গুরুতর আহত এবং অন্তত ৫ মহিলাকে ধর্ষণ করে। নিহতরা হলেনÑ নুরুল আলম, আবুল কালাম, জানে আলম, মিয়া খাঁ, আয়েশা খাতুন, সালেহ জহুর। গুলিতে আহতরা হলেনÑ মুন্সী মিয়া, খায়রুল বাশার।
অভিযোগ-১৪
১৯৭১ সালের ২০ মে বিকেল ৪টার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে তার সহযোগী কয়েক রাজাকার সদস্য পাকিস্তান সেনা সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানাধীন পথেরহাটের কর্তার দীঘির পারে মোঃ হানিফের বাড়িতে যায়। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করছিলেন। মোঃ হানিফের স্ত্রী এবং অন্যরা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আত্মীয় নাজমা খাতুনের মাধ্যমে মোঃ হানিফকে গুডস হিল নির্যাতন কেন্দ্র থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করে।
নাজমা খাতুন গুডস হিল থেকে ফেরত এসে তাদের জানায়, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মোঃ হানিফকে ছাড়ার জন্য এক হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে। ফলে মোঃ হানিফ গুডস হিল নির্যাতন কেন্দ্র থেকে আর ফেরত আসেনি। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারার কারণে মোঃ হানিফকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ-১৫
১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি শেখ মায়মুন আলী চৌধুরী তার ভাগ্নিজামাই মোস্তাক আহম্মেদ চৌধুরীর চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জের বাসায় ছিলেন। ঘটনার দিন কয়েক বন্ধুসহ চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানাধীন চন্দনপুরের ক্যাপ্টেন বখতিয়ারের বাসভবনে গল্পগুজবরত অবস্থায় থাকাকালীন আনুমানিক বিকেল তিনটা সাড়ে তিনটার দিকে হঠাৎ করে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে দুটি ট্রাকে পাকিস্তানী সেনাসদস্যসহ বেসামরিক পোশাকে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সমেত এসে বাসাটি ঘেরাও করে। এর পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ও নিয়ন্ত্রণাধীন ও পরিচালনাধীন গুডস হিল নির্য়াতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পরনের জাঙ্গিয়া ছাড়া সকল কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে হাত-পা বেঁধে তাকে দৈহিক নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ-১৬
১৯৭১ সালের ৭ জুন রাজাকার মাকসুদুর রহমান ও আসামির পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তান সেনাসদস্যদের সহযোগিতায় জামাল খান রোড থেকে ওমর ফারুককে ধরে নিয়ে গিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিযন্ত্রণাধীন গুডস হিলের চর্টার সেলে রাখা হয়। পরবর্তীতে আটকাবস্থায় তাকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।
অভিযোগ-১৭
১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যা আনুমানিক সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার দিকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার আরও ২/৩ জন সহযোগীসহ পাকিস্তান সেনাসদস্যরা চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পোড়োবাড়ি থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজামউদ্দিন আহম্মেদ এবং সিরাজ, ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করা হয়। অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর গজনফরের নেতৃত্বে ঘণ্টা দেড়েক তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়। অতঃপর সে দিন রাত ১১/১২টায় নিজামউদ্দিন ও সিরাজকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করা হয় সেখানে তার দেশ স্বাধীন হওয়ায় আগ পর্যন্ত বন্দী ছিলেন।
অভিযোগ-১৮
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টায় আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহচর মুসলিম লীগ নেতা শিকারপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মৃত শামসু মিয়া সহযোগী তিনজন রাজাকারসমেত চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানাধীন মোহারা গ্রামে আব্দুল মোতালেব চৌধুরীর বাড়িতে যায়, সেখানে গিয়ে তারা মোঃ সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে। এর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়িতে নিয়ে তাকে গুডস হিলে চর্টার সেলে নেয়া হয়। বাড়ির বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকা ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং তার ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীও উপিস্থিত ছিলেন। ঐ সময় সালেহ উদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে ফজলুল কাদের চৌধুরী জানতে চান, তিনি সালেহউদ্দিন কিনা। এ কথা বলতে বলতে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে মোঃ সালেহ উদ্দিনের বাম গালে সজোরে একটি চড় মারে।
অভিযোগ-১৯
১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক সাড়ে আটটায় হাটহাজারীর নেয়ামত আলী রোডের সাহেব মিয়ার বাড়ি (রজমান টেন্ডলের বাড়ি) ঘেরাও করে তার দু’ছেলে নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে অপহরণ করে। এর পর রশি দিয়ে বেঁধে গুডস হিলে চর্টার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের অপর ভাই মাহবুব আলমের সন্ধান পায়।
আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে গুডস হিলের নির্যাতন কেন্দ্রে থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।
অভিযোগ-২০
২৭/২৮ জুলই ৩/৪টায় রাজাকার বাহিনী আকলাচ মিয়াকে দরে নিয়ে যায়। এর পর তাকে গুডস হিলে নিয়ে নির্য়াতন করা হয় । সেখানে তার মৃত্যু ঘটে।
অভিযোগ-২১
১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ৫/৭ তারিখের দিকে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার বিনাজুরি গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরী একই জেলার কোতোয়ালি থানাধীন জেল রোডে অবস্থিত নিজস্ব ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে কাগজের দোকানে যান। সেখান থেকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ৩/৪দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
অভিযোগ-২২
১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন রাত আনুমানিক ৯টায় মোঃ নুরুল আনোয়ার চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগী আল শামস বাহিনীর সদস্যরা মৃত আশরাফ আব্দুল হাকিম চৌধুরীর বাসভবন ৪১‘২ স্ট্রান্ড রোড সদরঘাট, থানা ডবলমুরিং জেলা চট্টগ্রাম থেকে অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মোঃ নুরুল আনোয়ারের কাছ থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে।
অভিযোগ-২৩
২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সন্ধ্যা আনুমানিক সোয়া ছয়টা থেকে সাড়ে ছয়টার সময় আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ,মুসলিম ছাত্র পরিষদের সভাপতি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের আল শামস কমান্ডার হামিদুল কবির চৌধুরী প্রকাশ খোকা ,মাহবুব, সৈয়দ ওয়াহিদুর আলম গং চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানাধীন ৪০ আব্দুস সাত্তার রোড এলাকায় এম সলিমুল্লাহর একজন হিন্দু কর্মচারীকে মিথ্যা এবং বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে মারধর করতে থাকে। তাদের অভিযোগ হলো উক্ত হিন্দু কর্মচারী বিহারীদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। এম সলিমুল্লাহ এতে বাধা দিলে তাকে গুডস হিলে নির্যাতন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সারারাত নির্যাতন শেষে তার আত্মীয়দের অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল প্রধান এর পর তাদের আদেশ দেয়া শেষ করেন এবং সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এছাড়া ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ, হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্যের বিরুদ্ধে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন গত বছরের ৪ অক্টোবর সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরী বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। ৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডিও ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়।
২০১০ সালের ২৬ জুলাই সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। তাকে গ্রেফতারের জন্য ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে তদন্ত সংস্থা। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি পুড়িয়ে যাত্রী হত্যার এক মামলায় এ সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯ ডিসেম্ব^র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগেও তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।


Uploaded By : Khan Muhammad
This item has been recorded here as part of ICSF's Media Archive Project which is a crowd sourced initiative run by volunteers, a not for profit undertaking to facilitate education and research. The objective of this project is to archive media items generated by different media outlets from around the world - specifically on 1971, and the justice process at the International Crimes Tribunal of Bangladesh. This archive also records items that contain information on commission, investigation and prosecution of international crimes around the world generally. Individuals or parties interested to use content recorded in this archive for purposes that may involve commercial gain or profit are strongly advised to directly contact the platform or institution where the content is originally sourced.

Facebook Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Comments

comments

Archive I: Media Archive

Archives news reports, opinions, editorials published in different media outlets from around the world on 1971, International Crimes Tribunal and the justice process.

Archive II: ICT Documentation

For the sake of ICT’s legacy this documentation project archives, and preserves proceeding-documents, e.g., judgments, orders, petitions, timelines.

Archive III: E-Library

Brings at fingertips academic materials in the areas of law, politics, and history to facilitate serious research on 1971, Bangladesh, ICT and international justice.

Archive IV: Memories

This archive records from memory the nine-month history of 1971 as experienced and perceived by individuals from all walks of life.