Home » Article, Bengali, Dhaka, Politics

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ও কিছু প্রাসঙ্গিকতা

6 January 2010 Author: মীর্যা সিকান্দার Original Source: Link

সাংবিধানিক নিয়ম বিধিকে উপেক্ষা করে উদ্দীন সাহেবদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনের স্থলে দুবছর পরে ২৯ ডিসেম্বর/০৮ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। যা অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল ২২ জানুয়ারী, ২০০৬। এ নির্বাচনে কোথাও ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটকেন্দ্রে মারামারি, গোলাগুলীর কথা শোনা যায়নি। ভোট দিতে না পেরে কোন ভোটারকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরেআসতেও হয়নি। এমন সুন্দর ও সুশৃংখল নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না বলে উপায় নেই। সে কারণে দেশী, বিদেশী পর্যবেক্ষকগণ প্রশংসা করেছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ হয়েছে বটে। কিন্তু এত ব্যাপকভাবে ভোট কাষ্ট হওয়াটা ছিল কল্পনার অতীত। তাছাড়া শুধু মহাজোটই প্রায় ৮৫% সীটে বিজয় লাভ করবে এটাও ছিল স্বপ্নাতীত। কারণ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ মিলে ২০০১ সালের নির্বাচনের মত সুষ্ঠু সুন্দর অবাধ নির্বাচন এ পর্যন্ত হয়নি। এ নির্বাচনেও ৭০% এর উপরে ভোট কাস্ট হয়নি। অথচ ২০০৮ এর নির্বাচনে গড়ে প্রায় ৯৮% ভোট কাষ্ট হয়েছে। এমনকি কোন কোন কেন্দ্রে ১০৫% ভোটও কাষ্ট হয়েছে। এতে কি প্রমাণ হয় না যে নির্বাচন মোটেই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি? মহাজোটের এই অভাবনীয় ও অস্বাভাবিক বিজয় লাভে অনেক অভিজ্ঞজনের মন্তব্য হলো মহাজোট কি আলাউদ্দিনের প্রদীপ হাতে পেয়েছিল যে, এত বড় অসাধ্য তাদের সাধন হয়ে গেল? যাদের ১০% এর বেশী সীট পাবার কথা না তারা পেল প্রায় ৮৫% সীট। আর চার দলীয় জোটসহ সব থেকে বড় দলে মাত্র পেল ১১%? মহাজেটের আওয়ামী লীগ ছাড়া এবং শরীক দলের দু একজন বাদে আর সকলেরই এ পর্যন্ত জামানত রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তারাও বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছে। জনগণের রায় পেতে হলে জনগণের কল্যাণে কিছু ত্যাগ ও কুরবানী করতে হয়। পূর্বের কথা ছেড়েই দিলাম ১৯৯৬ সালে জামায়াতের সাথে গাঁট বেধে আওয়ামী লীগ জাতে ওঠে। সে কারণে নির্বাচনে বিজয় লাভ করে ক্ষমতায় যায়। গদীতে বসেই তারা বোমা বিস্ফোরণের চর্চা শুরু করে দিল। বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় অর্ধশতাধিক নিরপরাধ লোক নিহত হলো, সঠিকভাবে তদন্তও হলো না, বিচার করাও হলো না। এর সকল দায়ভার চাপানো হল জামায়াত, শিবিরের ঘাড়ে। দেশের মধ্যে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই রাহাজানি লুটপাট অপহরণ খুন ও ধর্ষণ বেড়ে গেল ব্যাপক হারে। বলাৎকার দিগম্বর ও নকল এ শব্দগুলোর সাথে দেশবাসীর পরিচয় ঘটালো। তখনই খুন এবং ধর্ষণের চর্চা হতে লাগলো বেপরোয়া গতিতে। দিন দুপুরে লোক খুন করে বারো টুকরা করে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হলো। বাধা দেয়ায় বাপ ভাইকে বেঁধে রেখে তাদের সামনেই এক যুবতীকে পাঁচজনে পালাক্রমে ধর্ষণ করলো। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে থানায় কেস নেয়া হল না। সাংবাদিকগণ বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট দেয়ায় কারো কারো জীবন দিতে হলো। জীবন ভয়ে পালিয়েও থাকতে হলো অনেকের। তাছাড়া প্রতিনিয়তই সাংবাদিকদের নির্যাতিত হতে হচ্ছিল। বিচারপতিদের রায় সরকারের পক্ষে না আসায় মন্ত্রীদের নেতৃত্বে বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল বের করা হলো। তাদের জীবন নাশের হুমকিও দেয়া হয়েছিল। দাড়িটুপি নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পথ চলা কঠিন হয়ে পড়েছিল একমাত্র চাউলের দাম সহনীয় ছিল তাছাড়া সকল জিনিষের দামই ছিল আগুন বরাবর। আইন শৃক্মখলা বলতে কিছুই ছিল না। সরকারী দলের যেমন তেমন লোকের মুখের কথাই ছিল আইন। আইন আদালত হয়ে পড়েছিল অর্থহীন। সরকারী দলের নেতা কর্মীদের দ্বারা যতই নির্যাতিত হোকনা কেন কারো প্রতিবাদ করা বা বিচার চাওয়ার উপায় ছিল না। সরকারী দলের যেমন তেমন কর্মীর বিরুদ্ধে থানায় কেস নেয়া ছিল হারাম। বরং কোন অপরাধী ধরা পড়লে যদি পরিচয় দিত আমি যুবলীগ বা ছাত্রলীগের ওমুক ওয়ার্ডের সদস্য তাহলে দারোগা সাহেব অত্যন্ত বিনীতভাবে চা-নাস্তা খাইয়ে থানার গাড়ীতে করে পুলিশ প্রহরায় বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। আল্লাহর দরবার ছাড়া মানুষের বিচার চাওয়ার আর কোন জায়গা ছিল না। তারা নির্বাচনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। পরিশেষে ২০০১ইং সালে নির্বাচন হলো। যদিও সরকার নির্বাচনে জিতার সকল ব্যবস্থা করেই পদত্যাগ করেছিল। কিন্তু নির্যাতিত জনগণ তাদের সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তাছাড়া নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকার ও প্রেসিডেন্টের নীতিবোধের কারণে তাদের ঐ নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোন কাজে লাগেনি। নির্বাচনের প্রথম দিকে শেখ হাসিনা নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন, রাত নয়টার পর যখন বিভিন্ন কেন্দ্রের ভরাডুবির কথা জানতে লাগলেন, তখন তার মাথা খারাপ হবার উপক্রম। তিনি বললেন, সূক্ষ্ণ কারচুপি হয়েছে। এ নির্বাচন মানি না। যদিও তিনি এবারকার নির্বাচন সুষ্ঠু হবার ব্যাপারে দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষকদের দোহাই দেন। কিন্তু সেদিন বিদেশী পর্যবেক্ষক পর্যন্ত বলেছিলেন, এ নির্বাচন (২০০১) অনন্য সুন্দর নির্বাচন। কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের এ মন্তব্যের প্রতি সম্মান দেখাতে পারেননি।
চারদলীয় জোট ব্যাপক সীট লাভ করে সরকার গঠন করল। শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন, এ সরকারকে এক দিনও শান্তিতে দেশ চালাতে দেব না। যদিও এবারের নির্বাচনের ওয়াদা পূরণের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না অথবা সাধ্যে কুলাচ্ছে না। কিন্তু জোট সরকারের নাজেহাল করার ওয়াদা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করেছিলেন। যদিও বলেছিলেন আমরা বিরোধী দলে গেলেও হরতাল ডাকব না। কিন্তু জোট সরকারের পাঁচটি বছর ধরেই হরতাল অবরোধ, ঘেরাও বোমাবাজী অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি দ্বারা দেশকে অরাজকতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে দেন। এতে সরকার নাজেহাল হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু দেশবাসীও কম নাজেহাল হয়নি। তাই কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলেও দেশবাসীর জন্য মহাসংকট বিরোধী দলে থাকলেও মহা সংকট। দেশে যখন ভয়াবহ বন্যা হলো বন্যার্ত মানুষের চরম দুর্দশায় তাদের পাশে গিয়ে না দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করেন বন্যার্ত অসহায় মানুষের জন্য কোন দেশ থেকে যেন সামান্যতম সাহায্যও না আসে। মহাজোটের অন্যান্য শরীক দলের দেশবাসীর কল্যাণে সামান্যতম ভূমিকাও কোন কালে ছিল না। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে লোক হত্যা করে লাশের ওপর লাফিয়ে যে উল্লাস করেছিল তাতে দেশে বিদেশে মহাজোট বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ইমেজ শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এরপরও কি কারণে দেশবাসী মহাজোটকে এত বিপুল ভোটে বিজয় করাবে? তাদের গর্বের এই বিপুল ভোটে বিজয়ের পেছনে যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং রয়েছে সে ব্যাপারে পত্র পত্রিকা, জনগণের মুখে মুখে শোনা এবং বাস্তবে চাক্ষুসভাবে যে অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে তা হল-
১। ভোটার তালিকায় আওয়ামী কর্মীরা প্রায় ৭০ লাখ ফল্স ভোটার তালিকাভুক্ত করেন।
২। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি।
৩। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ষড়যন্ত্র করে দুবছর ধরে জনসমাবেশ মিছিল, মিটিং গণসংযোগ বন্ধ করে দেয়। নির্বাচনের কিছুদিন আগে চারদলীয় নেতাদের মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায় যাতে জনগণের নিকট তারা দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিত হয় এবং নির্বাচনের জন্য ময়দানে কাজ করতে না পারে।
৪। নির্বাচনের আগের দিন চারদলীয় জোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে কালো টাকা ছড়ানোর মিথ্যে প্রপাগান্ডা করা হয় টিভি চ্যানেলগুলোতে।
৫। ভোটার আইডিকার্ড করেও ভোটের সময় তা ব্যবহার করা হয়নি।
৬। ব্যালট পেপার দুরকম ছিলম ছবিওয়ালা ও ছবিছাড়া। ছবিওয়ালাটা ছিল পুলিং অফিসারদের কাছে আর ছবি ছাড়াটা ছিল পোলিং এজেন্টদের কাছে যে কারণে পোলিং এজেন্টরা ভোটারকে সনাক্ত করতে পারেনি। তাছাড়া ছবিগুলোও ছোট ছিল যে নিজের ছবি নিজে সনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
৭। কোন কোন কেন্দ্রে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারে নৌকায় সীল মেরে তিনটি বাকস ভরা হয়েছিল যা প্রিজাইডিং অফিসারের রুমে গোপন করে রাখা হয়েছিল এবং ভোট গণনার সময় সেগুলোও ঢেলে দেয়া হয়।
৮। কোন কেন্দ্রে দাড়িপাল্লা বা ধানের শীসের বান্ডিল করা ১২০টি ব্যালট দিয়ে আর নৌকার বান্ডিল করা হয় ৮০টায়।
৯। কোন কেন্দ্রে ধানের শীষ বা দাড়িপাল্লার ব্যালটের নীচে ১০টা নৌকার ব্যালট ওপরে ১০টা নৌকার ব্যালট দিয়ে বান্ডিল বাঁধা হয়।
১০। কোন কোন কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় ধানের শীষ বা দাড়িপাল্লার ব্যালটের বান্ডিল বাইরে ফেলে দেয়া হয় যা পরে লোকেরা উদ্ধার করে। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে ঘোষণা করা হলো যার কাছে ব্যালট পেপার পাওয়া যাবে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। যাতে ব্যালট পেপার বাইরে ফেলে দেবার বিষয়টা প্রচার না হয়।
১১। কোন কেন্দ্রে চারদলীয় জোটের বেশী ভোট মহাজোটের প্রার্থীকে দেয়া হয়েছে আর মহাজোট প্রার্থীর কম ভোট চারদলীয় জোট প্রার্থীর নামে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বললেন, এটা ক্লারিক্যাল মিস্টেক। প্রশ্ন আসে ক্লারিক্যাল মিস্টেক হয়ে কোথাও নৌকার বেশী ভোট ধানের শীষের প্রার্থী বা দাড়িপাল্লার প্রার্থীর নামে উঠল না কেন?
১২। কোন কেন্দ্রে এত ব্যাপক হারে কারচুপি হয়েছে যে, ১০৫% পর্যন্ত ভোট কাস্ট হয়েছে।
এটাই বুঝি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নমুনা? যা নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও এমপি মহোদয়গণ অত্যন্ত গর্বের সাথে বলে থাকেন জনগণ আমাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে।
জনগণের মুখে শোনা অনিয়মের কথা বাদ দিলেও নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বহু প্রমাণ আছে যা নিবন্ধে কিছুটা উল্লেখ করা হল। তাছাড়া শরীকদলের বিশিষ্ট নেতা জেনারেল এরশাদ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সেনাবাহিনীর নিন্দা করবেন না। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা না পেলে কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় আসতে পারতেন না।
আওয়ামী লীগের সাবেক মহাসচিব প্রবীণ রাজনীতিবিদ আব্দুল জলিল বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই মহাজোট ক্ষমতায় এসেছে। যে কারণে আব্দুল জলিল সাবকে নির্যাতিত ও দারুণভাবে বঞ্চিত হতে হলো।
আমাদের সকলেরই বুঝে থাকা দরকার যে, কেউ নকল করে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে মিষ্টি বিতরণ করলেও অযোগ্যতার দরুন কর্মক্ষেত্রে তাকে পদে পদে ব্যর্থ হয়ে ইজ্জত রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

Keywords/

Added by: shagufta

Leave your response!

Add your comment below, or trackback from your own site. You can also subscribe to these comments via RSS.

Be nice. Keep it clean. Stay on topic. No spam.

You can use these tags:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

This is a Gravatar-enabled weblog. To get your own globally-recognized-avatar, please register at Gravatar.