২৫ মার্চ রাতের হামলা স্বাধীনতার স্পৃহা শক্তিশালী করে
মার্চ বাঙালির জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় মাস। ২৬ মার্চ আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করি। ২৫ মার্চ শেষ হয়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ আমাদের স্বাধীনতালাভের স্পৃহাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।
২৬ মার্চ আমাদের জীবনে একদিকে যেমন আনন্দের দিন, আবার অন্যদিকে তেমনি বেদনারও। কারণ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী সংঘটিত করে, সে কথা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। সেই সময়ের নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ নাৎসিদের বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ ছাড়া ৭ মার্চ আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনার রেসকোর্স ময়দানে একটি যুগান্তকারী ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ভাষণটি নানা দিক থেকে অসীম তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা ছিল। প্রয়োজন হলে গেরিলা যুদ্ধ কিভাবে করতে হবে, সেই ইঙ্গিতও ছিল। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে কিভাবে প্রতিরোধ করতে হবে, তার কথাও বলা ছিল। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ঘোষণা না দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষে স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন। তাঁর ভাষণের শেষ কথা ছিল_’এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বিশ্বে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ স্মরণীয় হয়ে আছে; যেমন_আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণ ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে’। এসব ভাষণের সঙ্গে তুলনা করলেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ঔজ্জ্বল্য আমাদের চোখে ধরা পড়ে। তা ছাড়া তিনি যখন এ ভাষণটি দেন, তখন দেশে একটি সংকটময় পরিস্থিতি ছিল। সেদিন যদি তিনি প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে দুটি ব্যাপারে আশঙ্কা ছিল_এক. পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখনই বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, দুই. বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে অভিযুক্ত হতেন। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তিনি ওই উভয় সংকট এড়িয়ে যান। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ঘোষণা দিলেন, আবার পরোক্ষভাবেও ঘোষণা দিলেন।
আরো একটি কথা, বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বিভিন্ন বিকল্পের কথা বলেছেন; পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনার পথ একেবারে বন্ধ করে দেননি। কিন্তু তারা যুক্তি না মানলে এবং নির্যাতন করার পথ বেছে নিলে কিভাবে বাঙালি তার জবাব দেবে, তারও ব্যাপক নির্দেশ দেন এবং কঠোর ভাষায় তিনি হানাদার বাহিনীকে সাবধান করে দেন। তিনি বলেছিলেন, বাঙালিদের ওপর যদি আর একটি গুলি চলে, তাহলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে আটকে রেখে ভাতে মারবেন, পানিতে মারবেন। এই ভাষণের আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ভাষার ব্যবহার। তিনি একই সঙ্গে প্রমিত বাংলা ও চলিত বাংলা মিশিয়ে কথা বলেছেন; যেভাবে বললে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষের বুককে স্পর্শ করে, তাদের আলোড়িত করে। আমরা আশ্চর্য হই, যখন দেখি ২০-২২ মিনিটের এ ভাষণে তিনি কত কথা বলেছেন। কত ভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিভাবে সবাইকে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। অথচ তাঁর হাতে কিংবা টেবিলের সামনে একটি চিরকুটও ছিল না।
সেদিনের ওই ভাষণ আমি রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে শুনিনি। তবে তা বেতারে সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ায় শুনতে পাই। সম্প্রতি একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে সংযোজিত হয়েছে। সেদিনের সেই ভাষণ শুনে আমি বিপুলভাবে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত হই। এই অনুপ্রেরণা আজও আমার জীবনে চলার পথে পাথেয়।
Keywords/








