Home » Article, Bangladesh, Bangladesh 1971 Trials, Bengali, Dhaka, Extremism, Fundamentalism, History, Religion, কালের কন্ঠ

যুগের বাণী : মৌলবাদীদের আঁতুড়ঘর এবং তোতা-কাহিনী

25 July 2010 Author: মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

আজকের লেখাটির জন্ম হয়েছে ১৮ জুলাই কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায় ছাপা একটি প্রতিবেদন পড়ার পর। প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল_ইসলামী ছাত্রশিবিরের যত তথ্য। সেটা পড়ে জানা গেল, দেশব্যাপী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্যের সংখ্যা সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ এবং সদস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
ইসলাম ধর্মবিশ্বাসের ছদ্মাবরণে ইসলামী ছাত্রশিবির আসলে মওদুদী দর্শনে বিশ্বাসী একটি দল এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্দেশ ছাড়া দলটির সদস্যরা কোনো কাজ করেন না। এই সংগঠনটি গণতন্ত্রের ভাবধারা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং সেহেতু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এটি গুরুতর বিপজ্জনকও বটে। ভারতের ইংরেজ শাসনের অবসান আসন্ন বুঝতে পেরে তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতারা ভারতের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটির জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তোলেন। অখণ্ড ভারতে শাসন ক্ষমতায় তাঁরা যে নড়বড়ে জায়গা পাবেন, সে তুলনায় পাকাপোক্ত জায়গা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা এ দাবি করেছিলেন এবং একটি ভৌগোলিক বুনিয়াদে একটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তাঁদের একমাত্র ধারণা ছিল।
কিন্তু একটি মুসলিম রাষ্ট্র ও একটি ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে যে আসমান-জমিন বিস্তর তফাত এবং মুসলিম রাষ্ট্রে মৌলবাদীদের যে কোনো জায়গা হবে না, সেটা বুঝতে পেরে মওদুদীসহ ৭৫ জন মৌলবাদী লাহোর শহরে মিলিত হয়ে জামায়াতে ইসলামী নামে একটি দল করেন। তাঁদের ও মুসলিম লীগ নেতাদের উদ্দেশ্য যে অভিন্ন ছিল না, সেটা অতি সহজেই বোঝা যাবে তরজুমান-ই-কোরআন পত্রিকায় তৎকালে ছাপা মওদুদীর একটি লেখা থেকে, ‘আমরা একটি মুসলিম সরকার চাই না। আমরা চাই ইসলাম শাসন করবে, মুসলমানরা নয়।’ ওই পত্রিকায় অন্য একটি সংখ্যায় মওদুদী লেখেন, ‘একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে আমরা উৎফুল্ল হওয়ার কোনো কারণ পাই না যে তুরস্কে তুর্কিরা শাসন করছে, ইরানে ইরানিরা এবং আফগানিস্তানে আফগানরা। একজন মুসলমান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি না, এ ধারণাটি যে ‘সরকার জনগণের, জনগণের কর্তৃত্ব ও জনগণের জন্য, বরং আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতায়।’ এই মতের সর্বনাশা দিক হচ্ছে, যেহেতু আল্লাহ সরাসরি তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করেন না, সেহেতু তাঁর পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে ওলামা সম্প্রদায়।
এটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চাতুরীপূর্ণ তত্ত্ব এবং খাঁটি ইসলামী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে মতবাদও বটে। কারণ ইসলামী দর্শন হচ্ছে, একজন নর কিংবা নারী অদৃষ্টবাদে কখনো বিশ্বাস করবেন না এবং নিজস্ব যুক্তিশীলতার ভিত্তিতে নিজ আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবেন, যা দ্বারা পরলোকে পুরস্কার কিংবা শাস্তি পাবেন। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রই অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভোটাধিকারই সে রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্মকাণ্ডের নিয়ামক হতে হয়। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, দেখা যাচ্ছে মওদুদীর মতো মৌলবাদীদের বোধে সেটা নেই। এই মৌলবাদী চিন্তাধারার জন্ম হয়েছিল অতীতের সে ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে, যেগুলোকে ঐতিহাসিক অ্যাক্সিডেন্ট বলা যায়। সেই অ্যাক্সিডেন্ট বা ঘটনা-পরম্পরার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া যাক। ১৭৭৪ সালে ছয় বছরব্যাপী ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবসানে বিবদমান পক্ষ তুরস্কের সুলতান ও রাশিয়ার জারের মধ্যে যে শান্তিচুক্তি হয়, তার একটি শর্ত অনুযায়ী তুরস্কের সুলতানের দখলে থাকা একটি মুসলমান-প্রধান অঞ্চল রাশিয়ার জারের কর্তৃত্বে আসে এবং এটার আপসরফায় তুরস্কের সুলতানকে ওই অঞ্চলসহ সব দেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সার্বভৌম খলিফা স্বীকার করে নেওয়া হয়।
উপরোক্ত শান্তিচুক্তির প্রেক্ষাপটে তৎকালীন একদল মুসলমান ইসলামী খেলাফতকে একটি রাজনৈতিক বুনিয়াদ হিসেবে দাঁড় করান। তাঁরা যুক্তি দেন, বর্তমান মুসলমানরা নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের তাই ফিরে যেতে হবে আল সালাফা বা পূর্বপুরুষদের আমলের শুদ্ধ ইসলামে এবং এর নেতৃত্ব দেবেন খলিফা। এই কার্যক্রমের তাঁরা নাম দেন সালাফিয়া, যার কালক্রমে নাম হয়ে যায় মৌলবাদী। ১৯২৪ সালের ১ মার্চ তুরস্কের জাতীয় সংসদ খলিফার পদ বিলুপ্ত করে এবং তুরস্ক একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর সালাফিরা তাঁদের আগের ধারণার বাইরে খলিফার সম্পূর্ণ নতুন এক সংজ্ঞা তৈরি করেন। তাঁদের খলিফা একজন আলেম হবেন এবং আলেমদের কর্তৃক তিনি নির্বাচিত হবেন। তাঁদের একজন নেতা মিসরের মোহাম্মদ রশিদ রিদা প্রস্তাব করেন, আলেম ও খলিফা হতে ইচ্ছুকদের প্রশিক্ষণের জন্য মাদ্রাসা স্থাপন করতে হবে। কিন্তু কালক্রমে এ ধারণাটি বাস্তবতার নিরিখে পরিত্যক্ত হয় এবং সালাফিয়া কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
১৯৪২ সালে মওদুদী আবার ওই কার্যক্রম শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আলোচ্য প্রতিবেদনে জানা গেল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্ম হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর গড়া মাদ্রাসাগুলোতে। এসব মাদ্রাসায় পড়ুয়ারা কেমনতরো বোধহীন হচ্ছে তার রূপক বর্ণনা দেওয়া যাক : এক যে ছিল পাখি। সে গান গাইত, শাস্ত্র পড়ত না। লাফাত, উড়ত; জানত না কায়দাকানুন কাকে বলে। রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, পাখিটাকে শিক্ষা দাও। সামান্য খড়কুটা দিয়ে পাখি যে বাসা বাঁধে, সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। সিদ্ধান্ত হলো, সবার আগে দরকার একটি খাঁচা। স্যাকরা এমন আশ্চর্য খাঁচা বানাল, তা দেখার জন্য দেশ-বিদেশের লোক ঝুঁকে পড়ল। তারা বলল, শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হলো। পাখির কী কপাল।
“পণ্ডিত বললেন, অল্প পুঁথির কাজ নয়। পুঁথি লেখকরা পুঁথির নকল করে এবং নকলের নকল করে পর্বতপ্রমাণ করে তুলল। যে-ই দেখল বলল, ‘শাবাশ, বিদ্যা আর ধরে না।’ খাঁচায় দানা নেই, পানি নেই। কেবল রাশি রাশি পুঁথির রাশি রাশি পাতা ছিঁড়ে কলমের ডগা দিয়ে পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হচ্ছে। গান তো বন্ধই, চিৎকার করার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। পাখিটি মরল। কোনোকালে যে কেউ ঠাহর পেল না। রাজা বললেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’ পাখি এল। রাজা পাখিটাকে টিপলেন। সে হা করল না, হু করল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খসখস গজগজ করতে লাগল।” (রবীন্দ্রনাথ, তোতা-কাহিনী, সংক্ষেপিত)
২০০১ সালের প্রথম দিনটিতে হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিটের দ্বৈত বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি থাকাকালে ফতোয়া দেওয়া নিষিদ্ধ করে একটি রায় দিয়েছিলাম। রায়টির শেষ অনুচ্ছেদ থেকে কিছু অনূদিত উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ‘এ বিষয়ে শেষ কথা বলার আগে আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি। প্রশ্নটি হলো, কেন একটি বিশেষ মহল মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠী গঠন করে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্মান্ধ হয়ে উঠছে?…দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হিসেবে আমরা একই ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি চালু এবং সংবিধানের ৪১(১) অনুচ্ছেদের আওতায় আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণকারী আইনের প্রস্তাব করছি। রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের নৈতিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে এবং তা কার্যকর করতে হবে। রাষ্ট্র অবশ্যই সমাজকে শিক্ষিত করে তুলবে।’
ইকবালের বক্তৃতাগুলোর সংকলন ‘ইসলামের ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন’ শিরোনামে বইটি থেকে অনূদিত সারসংক্ষেপ উদ্ধৃতি দিচ্ছি : প্রাচীন আর আধুনিক জগতের মাঝখানে ইসলামের নবীর আবির্ভাব। আরোহী বুদ্ধিবৃত্তির ফসল হচ্ছে ইসলাম। তার প্রমাণ হচ্ছে আর কোনো নবীর আবির্ভাব হবে না_কোরআনের এই ঘোষণা। এই ঘোষণার অর্থ, জীবন চিরকাল অন্যের পরিচালনায় চলার প্রয়োজন নেই, বরং নিজস্ব যুক্তিশীলতা দ্বারা জীবন পরিচালিত হওয়া জরুরি। ইসলামে পুরোহিত প্রথা নিষিদ্ধ তার একটি উদাহরণ। অপর উদাহরণ হচ্ছে, কোরআনে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার প্রতি এবং প্রকৃতি ও ইতিহাসের দৃষ্টান্তের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া। মানুষ অপরিহার্যরূপেই যুক্তিশীল এবং তার সদ্গুণগুলো মানুষের নিজস্ব যুক্তিশীলতারই প্রকাশ। এটি ধর্মবিশ্বাস সমর্থন করায় বটে, কিন্তু তার ভিত্তি ধর্মবিশ্বাস নয়। তার ভিত্তি আসলে প্রতিটি মানুষের প্রতি বিশ্বাস, প্রতিটি মানুষের প্রতি আস্থা থেকে উৎসারিত, বিচ্ছুরিত এবং এই যুক্তিশীলতা সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ারও ভিত্তি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট

Keywords/

Added by: abishchruto

Leave your response!

Add your comment below, or trackback from your own site. You can also subscribe to these comments via RSS.

Be nice. Keep it clean. Stay on topic. No spam.

You can use these tags:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

This is a Gravatar-enabled weblog. To get your own globally-recognized-avatar, please register at Gravatar.