মানবতাবিরোধীদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রযোজ্য কি না, হাইকোর্টের প্রশ্ন
যারা গণহত্যা করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও সংবিধানের মৌলিক অধিকার প্রযোজ্য কি না- এ প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য করা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দুই জামায়াত নেতার করা রিটের শুনানিকালে গতকাল মঙ্গলবার এ প্রশ্ন করে আদালত বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, এটা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ।’ আদালত আরো বলেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচারের জন্য সংবিধানে মৌলিক মানবাধিকার স্থগিতের কথা বলা হয়েছে। যারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের জন্য এ আইন। এটা সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য নয়।
জবাবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে এ ধরনের অপরাধে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের কথা বলা হয়েছে। আইনে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তিনি বলেন, সরকার বিচারের জন্য ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা তৈরি করে। এ তালিকায় কোনো বাংলাদেশির নাম নেই। এ তালিকা করার পরই তাদের বিচারের জন্য সংবিধান সংশোধন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন করে সরকার। কিন্তু গত বছর এ আইন সংশোধন করে তাতে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালকে। এটা সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের বেঞ্চে এ রিটের শুনানি শুরু হয় গতকাল। আদালত রবিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন।
জামায়াতের কারাবন্দি দুই নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লা সোমবার এ রিট করেন। রিট আবেদনে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী, ২০০৯ সালের সংশোধিত ট্রাইব্যুনাল আইনের সাতটি ধারা এবং জামায়াতের শীর্ষ চার নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলা বাতিল করার আবেদন জানানো হয়েছে।
গতকাল শুনানির শুরুতেই আদালত ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কাছে জানতে চান, ১৯৭৩ সালে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী হয়েছে। এত বছর পর কেন এসেছেন। আদালত আরো বলেন, সংবিধান সংশোধন করেছে জাতীয় সংসদ। এটা আদালত পরীক্ষা করতে পারে কি না?
জবাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। হাইকোর্ট সেটা বাতিল করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭৩ সালে সংবিধান সংশোধন হলেও এটার প্রয়োগ এখন আমার ক্ষেত্রে করা হচ্ছে। তাই এটা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।’
শুনানিকালে আদালত আরো বলেন, সংবিধান ও আইনে শুধুই যুদ্ধবন্দি বা সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিচারের কথা বলা হয়নি, সহায়ক বাহিনীর কথাও তো বলা হয়েছে। জবাবে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি তো (রিটকারী) সহায়ক বাহিনীর সদস্য নই। আর সহায়ক বাহিনীর সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাকে একটি দেশের সীমানার ভেতরে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী আমি তো সহযোগী বাহিনীর কেউ না।’
এ সময় আদালত বলেন, ‘আপনি সহায়ক বাহিনীর সদস্য কি না, তা নির্ধারিত হবে ট্রাইব্যুনালে চার্জ গঠনের পর।’
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, সংবিধানের প্রথম সংশোধনী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। এতে উচ্চ আদালতের ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। তখন আদালত বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যেতে পারবেন। এ ছাড়া আপনি তো কোনো নির্দিষ্ট আদেশের বিরুদ্ধে আসেননি। পুরো বিচার কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।’ তখন রাজ্জাক বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়া যাবে না। একমাত্র চূড়ান্ত রায়ের পরই কেবল আপিল করা যাবে। অথচ অভিযোগ গঠনের আগেই আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব আদেশে আমাকে সন্দেহভাজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল তা পারে না।’
শুনানির একপর্যায়ে আদালত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘যদিও আইনটি সঠিক। এর পরও মনে হচ্ছে, আইনে এক ধরনের শূন্যতা রয়েছে। কারণ আবেদনকারীর কেঁৗসুলি বলছেন, ট্রাইব্যুনালের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাওয়া যাবে না। তাই এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল কি না, সে ব্যাপারে আপনি বক্তব্য রাখবেন।’
Keywords/Tags: conspiracy against war crime trial, high court, Internationak crimes (tribunal) act 1973, Jamaate islami, war crimes trial, writ petition, জামায়াতে ইসলামী, যুদ্ধাপরাধ বিচারবিরোধী কার্যক্রম, যুদ্ধাপরাধী বিচার, রিট আবেদন, হাইকোর্ট, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট









Leave your response!