এরশাদের ড়্গমতা দখল অবৈধ : সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করল হাইকোর্ট
সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল ও শাসন অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এরশাদের সামরিক শাসনের বৈধতা দানকারী সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীকেও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মোঃ জাকির হোসেনকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় দেন। রায়ে বলা হয়েছে, অন্য সামরিক শাসকদের মতোই এরশাদও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী। তার এই কাজকে মার্জনা করা যেতে পারে না। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে এরশাদ তার দায় এড়াতে পারেন না। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের আলোকে এ ধরনের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া যেতে পারে। রায়ে বলা হয়, সংসদ চাইলে এ সংক্রান্ত বিষয়ে দণ্ডবিধি সংশোধন এবং অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীকে ফৌজদারি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারে যাতে অবৈধ কোন ক্ষমতা দখলকারী ভবিষ্যতে নির্বাচিত কোন সরকারকে উৎখাত করার দুঃসাহস না দেখায়। এছাড়া রায়ে সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, এই বিধান ছিল মুজিব নগর সরকার গঠন থেকে সংবিধান কার্যকর করার সময় পর্যন্ত সমস্ত ক্রান্তিকালীন বিধানকে বৈধতা দেয়ার জন্য। ফলে এই অনুচ্ছেদের আর প্রয়োজন নেই। দুপুর ১২ টা ৪৩ মিনিটে রায় দেয়া শুরু হয়। শেষ হয় ২টা ৪৭ মিনিটে। আদালত ১৯৪০ সাল থেকে ভারত বর্ষের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, স্বাধিকার ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের বর্ণনা রায়ে তুলে ধরেন। রায়ে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের বর্ণনা দেয়া হয়। একই সঙ্গে ওই সময়কার সামরিক শাসকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড রায়ে উঠে আসে।
রায়ে সপ্তম সংশোধনী অসাং-বিধানিক ঘোষণা করে বলা হয়, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত জারি করা সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, সামরিক আইন নির্দেশ অধ্যাদেশ এবং অন্যান্য আইন অবৈধ। ওই সময়ে জনস্বার্থে নেয়া কোন সিদ্ধান্ত বা কাজ ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা এড়ানোর জন্য মার্জনা করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এ নয় যে, যেগুলো মার্জনা করলাম সেগুলো বৈধ হয়ে গেল। সেগুলো বৈধ নয়, আজীবনের জন্য অবৈধ থাকবে।
রায়ে বলা হয়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোঃ আবু সায়েম, জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদও অবৈধ ড়্গমতা দখলকারী। জিয়াউর রহমানের পর রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে এরশাদ ড়্গমতায় আসেন। যদিও তখন এরশাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির প্রয়োজনে তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু দেশের জনগণ ক্ষমতা দখলের জন্য তাকে ডেকে আনেনি। এরশাদ সংবিধান স্থগিত করেছেন, সামরিক আইন জারি করেছেন। একই সঙ্গে জনগণের মৌলিক অধিকার স্থগিত করেছেন। ১৯৮৬ সালে বিভিন্ন বিধিমালা ও সামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশাপাশি সংসদে সপ্তম সংশোধনী পাস করে তা জায়েজ করেছেন। কিন্তু সংবিধানে সামরিক আইন জারির কোন বিধান নেই। তাই সামরিক আইন জারি অবৈধ। সংসদও সংবিধান পরিপন্থি কোন আইন পাস বা তার বৈধতা দিতে পারে না। তাই সামরিক আইন ও আদেশ অবৈধ হওয়ায় এর অধীনে করা সমস্ত কাজ, ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা এবং সেই ট্রাইব্যুনালের বিচারও অবৈধ।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, সংবিধান জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। সংবিধান অনুযায়ী জনগণই রাষ্ট্রের সকল ড়্গমতার মালিক। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ওপর সামরিক আইনসহ অন্য কোন আইনের অবস্থান হতে পারে না। রায়ে বলা হয়, জিয়ার উত্তরসূরী হিসেবে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছেন। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সংবিধান স্থগিত করেছেন। সামরিক শাসন জারি করে সামরিক ফরমানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
রায়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ব্যাখ্যা করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করে। এ সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। তখন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। বঙ্গবন্ধু দেশে এসে প্রথমে রাষ্ট্রপতি পরে প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সংবিধানের চার মূলনীতি প্রণয়ন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রীয় ড়্গমতা দখল করে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এগুলো করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তাকে সহযোগিতা করেন জিয়াউর রহমান। পরে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য বেতারের নাম পরিবর্তন করেন। বাংলার সুমিষ্ট শ্লোগান ‘জয় বাংলার’ স্থলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ চালু করেন।
রায়ে বলা হয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলেন সেই শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যদেরকে পুনর্বাসন করা হয়। এছাড়া স্বাধীনতা বিরোধীদের শুধু ছেড়েই দেয়া হয়নি, বাতিল করা হয় দালাল আইন। ধর্মনিরপেড়্গতা বাদ দিয়ে সংবিধানে যুক্ত করা হয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিধান। ফলে জিয়াউর রহমান সংবিধানকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছেন। চালু করেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
রায়ে রিট আবেনকারী সামরিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত সিদ্দিক আহমেদ সম্পর্কে বলা হয়, আদালত মনে করে তার সাজাদানও অবৈধ। কিন্তু এই আদালত থেকে এবং রিট মামলায় তিনি কোন প্রতিকার পেতে পারেন না। তার জন্য অন্য ফোরাম খোলা রয়েছে। তিনি চাইলে সিআরপিসির ৫৬১ এ ধারা মোতাবেক আদালতের কাছে আসতে পারেন। অন্যদিকে সরকারও প্রয়োজনীয় পদড়্গেপ নিতে পারে।
রায় প্রদানকালে জনাকীর্ণ আদালতে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এম কে রহমান ও মুরাদ রেজা, ব্যারিষ্টার এম আমীর-উল-ইসলাম, এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, এডভোকেট এ এম আমিনউদ্দিন, রিট আবেদনকারীর কৌঁসুলি ব্যারিষ্টার হাসান এস এম আজিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণকে কেন বেআইনি, অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে গত এপ্রিল মাসে সরকারের প্রতি রম্নল জারি করে হাইকোর্ট। পাশাপাশি এরশাদের জারি করা সকল ফরমান, আদেশ, সামরিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায় ও আদেশ এবং কার্যক্রমকে বৈধতাদানকারী সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীকে কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চায় আদালত। একটি হত্যা মামলায় সামরিক আদালতে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের অধিবাসী ব্যবসায়ী সিদ্দিক আহমেদের দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এসব আদেশ দেয়। এছাড়া সিদ্দিক আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলাটি কেন পুনরায় বিচার করতে নির্দেশ দেয়া হবে না তাও জানতে চেয়েছে আদালত।
বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে হটিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ মার্শাল ল’ জারি করে ড়্গমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এইচএম এরশাদের জারি করা সকল সামরিক ফরমান, আদেশ, সামরিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায় ও আদেশ এবং তার কার্যক্রমের বৈধতা দেয়া হয় সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে। এ ব্যাপারে কোনো আদালতে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না বলে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে একটি ধারা সংযোজন করা হয়।
যে ভাবে রিট মামলা
১৯৮৪ সালের ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামের মশলা ব্যবসায়ী আবু তাহের খুন হন। তাকে তার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। এই ঘটনায় ২৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কোতয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। কোতয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক আতাউর রহমান বাদি হয়ে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রচলিত আইনে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং পরবর্তীকালে দায়রা আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় একটি সামরিক ফরমানের মাধ্যমে তা বিশেষ সামরিক আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ১৯৮৬ সালের ১২ মার্চ মামলাটি সামরিক আদালতে পাঠানো হয়। পাঠানোর ৭ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়। এই মামলায় চট্টগ্রামের সামরিক আদালত ১৯৮৬ সালের ২০ মার্চ সিদ্দিক আহমেদ, নূর মোহাম্মদ ও নূরম্নল আনোয়ারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ওই বছরেই ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এরশাদ ওই রায় বহাল রাখেন। রায় প্রদানের সময় সিদ্দিক আহমেদ পলাতক ছিলেন।
২০০৬ সালের ২ আগস্ট পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসক এরশাদের জারিকৃত একটি ফরমানের মাধ্যমে এই সামরিক আদালত (কোর্ট মার্শাল) গঠন করা হয়। প্রচলিত আইনে বিচার চলাকালীন মামলাটি সামরিক ফরমানের মাধ্যমে কোর্ট মার্শালে প্রেরণ এবং বিচার কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন রায়ে সংড়্গুব্ধ সিদ্দিক আহমেদ। গত ২৪ জানুয়ারি হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করা হয়। এছাড়া উক্ত রিট আবেদনে সংবিধানের ৭ম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসক এরশাদের ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত জারি করা সকল সামরিক ফরমান, আদেশ, সামরিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায় ও আদেশ ইত্যাদির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
Keywords/Tags: 7th amendment, constitution, Constitutional Issues, ershad regime, ইত্তেফাক, ইত্তেফাক, এরশাদের শাসনামল, সংবিধান, সাংবিধানিক প্রসঙ্গ, ৭ম সংশোধনী









Leave your response!