গোলটেবিলে আইনজ্ঞদের অভিমত বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরা মানে পেছনে ফেরা নয়
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া মানে পেছনে ফিরে যাওয়া নয়। বরং এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের মূল কাঠামোয় ফিরে যাওয়া যাবে।
গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে তরুণদের সংগঠন ‘জাগরী’ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় আইনজ্ঞরা এ অভিমত তুলে ধরেন। ‘আমরা জানতে চাই: সংবিধান সংশোধন, কিছু প্রশ্ন ও আমাদের অভিমত’ শীর্ষক এই আলোচনায় তাঁরা বলেন, সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মূল চেতনায় ফিরে গিয়ে ভবিষ্যৎমুখী হওয়া।
আলোচনা সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীরা সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল এবং বেশ কিছু অসংগতি নিয়ে আইনজ্ঞদের প্রশ্ন করেন। তরুণদের এসব প্রশ্নের উত্তর দেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ্দীন মালিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক মিজানুর রহমান খান। আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজিম প্রশ্ন করেন, সংবিধান সংশোধন কেন জরুরি? বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া মানে কি পেছনে ফিরে যাওয়া নয়? উত্তরে কামাল হোসেন বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন মানে পেছনে ফিরে যাওয়া নয়। জাতি হিসেবে আমাদের মূল চেতনার কাছে ফিরে যাওয়া।’ তিনি বলেন, সবার আগে মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হওয়া উচিত।
শাহ্দীন মালিক বলেন, সবকিছুর মূল থাকে। মূল না থাকলে বেড়ে ওঠা যায় না। তাই বাহাত্তরে ফিরে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তা হলো মূলের কাছে ফিরে যাওয়া। কিছু সংশোধনের কারণে মূলে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এগুলো দূর করা দরকার।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘ফিরে যাওয়া মানে মৌলিক নীতিতে ফিরে যাওয়া। এর মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎমুখী হব। এটাই সংশোধনের উদ্দেশ্য।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক তাহমিনা খানমের প্রশ্ন ছিল: সবার অংশগ্রহণে সংবিধান সংশোধন না হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন দলের শাসনের সময় রাজনৈতিক কারণে সংবিধান সংশোধনের রীতি তৈরি হতে পারে। এ থেকে মুক্তির উপায় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সব দলের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। জনগণের অংশগ্রহণ না থাকলে সুফল পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে গঠিত কমিটিকে উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন নিয়ে আমরা কিছুটা অগোছালো অবস্থায় আছি। গণভোটের বিধানটি বাতিল হয়েছে। তবে যেকোনো উদ্যোগ সবাই মিলে নিলে এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকে।’
সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সংশোধনী আনার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন আদিবাসী তরুণী এলিয়া দেওয়ানসহ কয়েকজন। তাঁরা বাহাত্তরের সংবিধানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কথা না থাকার ব্যাপারে আইনজ্ঞদের কাছে জানতে চান।
এ বিষয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘সংবিধান প্রণয়নের সময় আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছি। আমি কখনো ভাবিনি, এ কারণে আদিবাসীদের একদিন সমস্যায় পড়তে হবে।’ তিনি বলেন, এখন যেহেতু সময় এসেছে, তাই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বলতে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর নাম অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আলোচনায় রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে জানতে চান কয়েকজন পেশাজীবী ও শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিজেতা বিজেন সাহা প্রশ্ন করেন, যাঁরা মুসলমান নন, তাঁরা তো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা আনতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে কি তাঁরা সংবিধান লঙ্ঘন করছেন?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ কামাল হোসেন বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, ধর্মের কোনটা ব্যবহার আর কোনটা অপব্যবহার, তা নির্ণয় করা সহজ নয়। এ জন্য রাজনীতি থেকে ধর্মকে দূরে রাখাই ভালো। তিনি বলেন, ‘যাঁরা ধর্মের অপব্যবহার করে রাজনীতি করেন, তাঁরা সবাই ফ্রড। ইসলামের অপব্যবহার যাঁরা করেন, তাঁরা ইসলামিক ফ্রড। ধর্মীয় রাজনীতি যেখানে আছে, সেই দেশগুলো মোটেও আরামে নেই।’
আসিফ নজরুল বলেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে ধর্মভিত্তিক দল বাতিল হবে না। কেননা, সংবিধানে সমিতি বা সংঘ করা যাবে না বলে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক দল এর মধ্যে পড়ে না। জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে বেশি ধর্মের অপব্যবহার করেছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগও তা করেছে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বন্ধ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তা করা যেতে পারে।
মিজানুর রহমান খান বলেন, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকাটা যৌক্তিক। ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করারও উদ্যোগ থাকা দরকার।
সভার শেষ পর্যায়ে কামাল হোসেনের কাছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধামন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে জানতে চান আসিফ নজরুল। এ বিষয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োজন সেই সময় ছিল। বঙ্গবন্ধু আমাকে এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে এখন এর সংশোধনী আসতে পারে।’
আলোচনার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জাগরীর সদস্য ও ‘আমরা জানতে চাই’ কর্মসূচির সমন্বয়কারী বিধান চন্দ্র পাল।
Keywords/Tags: আসিফ নজরুল, ড. কামাল হোসেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বাহাত্তরের সংবিধান, শাহ্দীন মালিক









Leave your response!