Home » Bengali, Dhaka, Freedom Fighter, News, যুগান্তর

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম দুর্নীতি : প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুব্ধ

1 September 2010 Original Source: Link

নানা অনিয়ম আর দুর্নীতি শেকড় গেড়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এখানে প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করতে পারছেন না। আবার অনেক অমুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। অভিযোগ উঠেছে, অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়ম হচ্ছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও আজ পর্যন্ত দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। বিভিন্ন সরকারের সময় সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ে এমন কিছু নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যারা কখনও মুক্তিযুদ্ধে অংশই নেয়নি। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আজ বিতর্কিত। জানা গেছে, কিছু দিন ধরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু নানা কারণে এসব মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। উপরন্তু যাদের নাম বিগত সময়ে সরকারের বিভিন্ন তালিকায় ছিল তাদের নাম বাদ দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। কাউকে কাউকে আবার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছ থেকে নাম অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে আসার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, গত মাসে তাকে মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি দেয়া হয়। তাতে তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা এর সত্যতা নিশ্চিত করতে তার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি থেকে সনদ আনার জন্য বলা হয়েছে। তিনি জানান, এ চিঠি পেয়ে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মন্ত্রণালয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। মন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন বলে তাকে আশ্বস্ত করেন। মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে তিনি যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তার একাধিক সনদ রয়েছে। মুক্তিবার্তায় তার নামও রয়েছে। অথচ তাকে কি না মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়। তিনি জানান, যতদূর জানতে পেরেছেন, তাতে শিগগিরই মন্ত্রণালয় থেকে নিজেদের ভুল স্বীকার করে তাকে একটি চিঠি দেয়া হচ্ছে। তার মতো আরও একজন পুলিশ কর্মকর্তা যিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাকেও এরকম একটি চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বরগুনা জেলার ছয়জন মুক্তিযোদ্ধার একটি তালিকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেটে আজ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানা গেছে। তালিকা থেকে ভুলবশত বাদ পড়া ওই ছয়জন মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বরগুনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হলেও আজও তা করা হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা ওই ছয়জনকে গেজেটভুক্ত না করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন আঃ লতিফ, সাহাব উদ্দিন আহমেদ, মোঃ জালাল আহমেদ, মরহুম এ এ জামান, মোঃ ইউনুস মিয়া ও মোঃ মোস্তফা কামাল। জানা গেছে, গেজেটভুক্ত করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ ১২ জুলাই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ওই আবেদনের ওপর মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এদিকে এ বিষয়ে জানতে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশি ষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ছয়জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ইউনুস মিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা নন মর্মে তার এলাকা থেকে নাম-ঠিকানাবিহীন একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ওই অভিযোগের তদন্তও করিয়েছিল ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট। ওই তদন্ত রিপোর্টে বরগুনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক স্বপন কুমার সরকার উলে খ করেন, ইউনুস মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের নাম ও ঠিকানা উলে খ না থাকায় অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুর রশীদ লিখিতভাবে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে, ইউনুস মিয়া একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর চলতি বছরের মে মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে কর্মরত শাহাদাৎ হোসেন বিষয়টি তদন্ত করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন স্বীকৃত তালিকায় ইউনুস মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তিনি তার প্রতিবেদনে ইউনুস মিয়া মুক্তিযোদ্ধা নন বলে উলে খ করেছেন। জেলা প্রশাসকের তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে চাননি। অন্যদিকে বরগুনার জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল রশীদ বলেন, এরশাদ আমলে তৈরি করা মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় তালিকা প্রথম খণ্ডে এ ছয়জনের নাম রয়েছে। ২০০৫ সালে যখন যাচাই-বাছাই হয় তখনও তাদের নাম জেলা প্রশাসকের চূড়ান্ত তালিকায় ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় কেন যে তাদের গেজেটভুক্ত করছে না তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিকে ইউনুস মিয়ার পক্ষ থেকে সম্প্রতি উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তালিকা পাঠালেই যে কারও নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে তা কিন্তু নয়। এ জন্য অনেক যাচাই-বাছাই করতে হয়। তিনি বলেন, ছয়জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ইউনুস মিয়া সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। বাকিদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে নানারকম অনিয়ম ও দুর্নীতিতে চরম ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে খাদ্য অধিদফতরে কর্মরত কেএম কাঞ্চন আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের উচিত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুই-তিন হাজার টাকায় মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দিয়ে বাণিজ্য করা হচ্ছে। তিনি নিজের এলাকা কাঁঠালিয়ার কথা উলে খ করে বলেন, এরশাদ সরকারের আমলে তার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০ জন। এখন সে সংখ্যা ২৫০ জনের কাছাকাছি।

Keywords/Tags: , ,

Added by: Shoeb

Comments are closed.