খালেদা জিয়া, সেনা-মাতা থেকে যুদ্ধাপরাধ-কন্যা
ওয়ান ইলেভেনের পর থেকেই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সেনাবাহিনীর বন্ধুত্বে টানাপড়েন দেখা দেয়। ২৭ আগস্ট তাদের ইফতার পার্টিতে যোগ না দেয়ার মধ্যদিয়ে ৪০ বছরের এক মধুর সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল। আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুরোপুরিভাবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। পাকিস্তান আমলে কমিশনপ্রাপ্ত সর্বশেষ অফিসারটিও অবসরে চলে গেছে। এ বাহিনীটি এখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি ইউএন পিস মিশনের পেশাদারিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাত্র ১ বছরে ৮ কোটি ১০ লক্ষ ভোটারের ছবিসংবলিত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে, এককভাবে যে কৃতিত্ব আর কেউ দাবি করতে পারবে না। তারা পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা থেকেও অনেকখানি সরে এসেছে। খোদ পাকিস্তানে ‘আইএসআই’ বড়রকমের বেকায়দায় থাকায় অনেক দিন এদিকে নজর দিতে পারেনি, সেটাও একটা কারণ। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার অফিসটিতেও নাকি ‘পাক-ভূত’ তাড়িয়ে নতুন করে মিলাদ দেয়া হয়েছে!
কোল্ডওয়ারের সময় ইসলামিস্টরা সাম্রাজ্যবাদের দোসর ছিল। তারাই এখন ফ্রাঙ্কেসটাইন হয়ে ক্ষমতার দাবি তুলেছে। আজ তারা অ্যাস্টাবলিশমেন্টের অংশ নয়, বরং বিদ্রোহী শক্তি। সেনাবাহিনীকে তারা আর ক্ষমতার উৎস মনে করে না। জঙ্গিবাদেই তাদের আস্থা! তথাকথিত সশস্ত্র ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে। তাই তো একসময়ের ‘সেনা-মাতা’ খালেদা জিয়াও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে তার আদর্শিক পিতা গোলাম আযমের পাশে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন।
দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর সুযোগ্য শিষ্যরা যুদ্ধাপরাধের দায়ে বন্দি হওয়ায় পালের গোদা গোলাম আযম এখন নিজেই মাঠে নেমেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জামায়াতের ‘মাস প্লাটফর্ম’ হিসেবে বিএনপির জন্ম হলেও মূল দল রক্ষায় তাদেরকেই এখন মুখ্য ভূমিকা রাখতে হচ্ছে। বস্তুত এ লক্ষ্যেই বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। ৬০ দশকে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ায় অনেক বাঘা নেতাই সেদিন ন্যাপ এবং আওয়ামী লীগের ব্যানারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন। জামায়াতের অনেক রোকনকেই টাইম টু টাইম বিএনপিতে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে। তারা সবাই এখন দলের মধ্যে ভালো অবস্থানে আছে। তরুণ নেতৃত্ব যাতে জামায়াতবিরোধী হয়ে না ওঠে সেদিকে নজর রেখেই ৮ জন যুগ্ম মহাসচিব বাছাই করা হয়েছে। তাদের একটা বড় অংশ খাঁটি জামায়াত-মুসলিম লীগ পরিবার থেকে আসা। কারো কারো পূর্বপুরুষ শান্তি কমিটির সক্রিয় সদস্যও ছিল। একজনের মহান পিতা তো দালাল আইনে জেলও খেটেছে!
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এখন গোলাম আযমের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কর্মকাণ্ড তদন্ত করছে। যেকোনো দিন গ্রেপ্তার করা হতে পারে এমন আশঙ্কায় সেদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলাপে তার অনুপস্থিতিতে দল কীভাবে চলবে সেটাই প্রাধান্য পায়। শুনেছি গোলাম আযম পরম আস্থার সঙ্গে খালেদা জিয়ার হাতে মৌলবাদের অর্থনীতির ‘কম্বিনেশন নাম্বার’, সৌদি-পাকিস্তান কানেকশনের ‘এক্সেস কোড’ এবং জঙ্গি নেটওয়ার্কের ‘অ্যাক্টিভেশন কী’ তুলে দেন। খালেদা জিয়াও জামায়াত-শিবিরের সকলকে নিজের আপন ভাইদের মতো দেখার ওয়াদা করেন। ইতিমধ্যেই দলটির মধ্যপর্যায়ের নেতাদের ওহাবি দাড়ি কামিয়ে জিন্স-হাওয়াই শার্ট পরিয়ে বিএনপি-ছাত্রদলে আত্তীকরণ শুরু হয়ে গেছে। মুক্তাঙ্গনের সমাবেশে ইদানীং এসব নতুন মুখের দেখাও মিলছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কার্যত এখন একাধারে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং পেরেন্ট সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির! সে লক্ষ্যে দলটির গঠনতন্ত্রে ‘নারী নেতৃত্ব’ বিষয়ক প্রয়োজনীয় সংশোধনীও সহসা সেরে ফেলা হবে।
বিএনপি সেনা গর্ভ থেকে জš§ নিয়েছে। জিয়ার মৃত্যুর পর তাদের হাত ধরেই খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা। তার তৈরি হওয়ার সময়টায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ক্ষমতায় রাখা হলেও ১৯৯১ সালে তারাই বিএনপির নির্বাচন করেছে এবং তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। ১৯৯৬ সালে একটি পতিত সরকার হওয়া সত্তে¡ও ১১৪ আসনের সম্মানজনক অবস্থানে এনে দিয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচন, পুরোটাই ছিল তাদের হাত-সাফাই! কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দু’যুবরাজের আকাশছোঁয়া দুর্নীতির অভিযোগ সেনাবাহিনীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। এক-এগারোর বাস্তবতায় তদানিন্তন ডিজিএফআই দুর্নীতির অভিযোগে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে যতটুকু সম্ভব এককাতারে এনে বিএনপিকে আবার ধোয়ামোছা করে রাজনীতির মাঠে দাঁড় করায়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রপাচার এবং লাগামহীন দুর্নীতির কথা মাথায় রেখে তারা এত প্রতিক‚লতার মধ্যেও তারেক-কোকোকে দেশ থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু খালেদা জিয়া তাতেও সন্তুষ্ট নন-কেন তাকে ক্ষমতায় বসানো হলো না! নিতান্ত অনন্যোপায় হলে অন্তত ১০১ সিট দেয়া হলো না কেন? যাতে আওয়ামী লীগ সংবিধানে হাত না দিতে পারে। বিডিআর বিদ্রোহের সুযোগে ক্ষমতা দখল না করায় ম্যাডাম যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন। তিনি নাকি মইন ইউ আহমেদকে ‘মুরগি জেনারেল’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন! তিনি আরেকবার ক্ষমতায় গেলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট নিশ্চয়ই ভালুকা পাঠাবেন এবং নিজ হাতে তৈরি ‘র্যাব’কে আরো শক্তিশালী করে ট্যাংক-কামান কিনে দেবেন।
২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও ১০ ট্রাক অস্ত্রপাচারের তথ্য ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা না করায় এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাধা না দেয়ায় খালেদা জিয়া সেনা যোগাযোগ ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। কর্নেল তাহেরের বিচারের ফাইলটি রি-ওপেন হওয়ার মধ্যদিয়ে বিরোধটি তুঙ্গে গিয়ে পৌঁছে। ২৭ আগস্ট তাদের চ‚ড়ান্ত ছাড়াছাড়ি হয়। সেদিন তিনি সেনাকুঞ্জে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বৃহত্তর ঐক্য জোট গড়ায় ব্যস্ত ছিলেন! এ তিক্ত বিচ্ছেদের মধ্যদিয়ে খালেদা জিয়ার সেনাপ্রধানের বাড়ির অবৈধ দখল থেকে উচ্ছেদ করা ছাড়াও বহু কিছুই এখন ঘটবে যা কেউ ভাবেনি আগে! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়ার সম্পৃক্ততার প্রামাণ্য দলিলসহ বহু তথ্যই আজ জাতির সামনে খোলাসা হবে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহেরসহ জিয়াউর রহমানের হাতে বলি হওয়া প্রতিটি সেনা সদস্যদের পরিবার এখন তাদের স্বজন হারানোর সত্যিকারের ইতিহাস জানতে পারবে। রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে খালেদা জিয়া ক্রমেই ‘সেনা-মাতা’ থেকে হয়ে উঠবেন ‘যুদ্ধাপরাধ-কন্যা’!
Keywords/Tags: amader somoy, bnp, conspiracy against war crime trial, Jamaate islami, Khaleda Zia, War Crime Trial, আমাদের সময়, খালেদা জিয়া, যুদ্ধাপরাধ বিচারবিরোধী কার্যক্রম, যুদ্ধাপরাধ-কন্যা, যুদ্ধাপরাধী বিচার, সেনামাতা









Leave your response!