যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তাব পাস
ঢাকা, ফেব্র“য়ারি ১৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- মন্ত্রীর আশ্বাসে আশ্বস্ত না হয়ে সংসদ সদস্যরাই চাপ দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে একটি প্রস্তাব পাস করেছে।
প্রস্তাব উত্থাপনের পর মন্ত্রীর আশ্বাসে প্রত্যাহারের আবেদন, এরপর সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত প্রতিবাদ, প্রস্তাব স্থগিতে সংসদ উপনেতার পরামর্শ, এরপর পুনরায় উত্থাপন- সবমিলিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে নাটকীয়ভাবে প্রস্তাবটি পাস হয়।
যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজে বাধা দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়ায় সরকারকে এখন এজন্য একটি আইন করতে হবে।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার চলাকালেই সংসদে এই প্রস্তাব পাস হল। যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাধা দেওয়ার ষড়যন্ত্রের কথা ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আগে থেকে বলে আসছেন। তাদের অভিযোগের তীর বিএনপি ও জামায়াতের দিকে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ও বর্তমান আমিরসহ ছয় নেতা এবং বিএনপির এক সংসদ সদস্যসহ দুই নেতার বিচার চলছে।
প্রস্তাবটি পাসের সময় বিএনপি কিংবা জামায়াতের কোনো সংসদ সদস্য অধিবেশনে ছিলেন না। তারা দীর্ঘদিন ধরে সংসদ বর্জন করে আসছেন।
সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই বেসরকারি এই প্রস্তাবটি পাস হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুতে তিন বছর আগে বেসরকারি আরেকটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের দিনে ঢাকা-২০ আসনে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। তখন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী।
‘সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য যারা বাধাগ্রস্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধিবিধান গ্রহণ করা হউক’- এই প্রস্তাব করে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজীর।
এই প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব আনেন সাত জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে অধিবেশন কক্ষে ছিলেন শহীদুজ্জামান সরকার, ইসরাফিল আলম, মুজিবুল হক চুন্নু, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, নাজমা আক্তার ও গোলাম দস্তগীর গাজী। প্রস্তাবের আগে ‘অবিলম্বে’ শব্দটি যোগ করার পরামর্শ আসে াদের কাছ থেকে।
এরপর আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত করছে, তাদের বিচার প্রচলিত আইনেই করা যায়।”
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সরকার নমনীয় বলে, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে না। তবে যে কোনো মুহূর্তে এদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে।”
আইন প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসের পর বেনজীর প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের আাবেদন জানিয়ে বলেন, “আমি এ প্রস্তাবটি এনেছিলাম যেন কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে যুদ্ধাপরাধীরা বেরিয়ে যেতে না পারে। ৩০ লাখ শহীদের পরিবারের সদস্যরা রাজপথে নেমে এসে ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার চাইলে তখন কী করবেন?
“সাঈদীর এখন সেই তাবিজ বেচার চেহারা নেই। এখন এই সাঈদীকে দেখে কি মনে হয়, সে মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী ও পরিবারের নারী সদস্যদের পাশবিক নির্যাতন করেছিলেন? এ বিচার বানচাল করতে বিদেশে অনেক সংগঠন কাজ করছে। সাক্ষীদের কিনতে চাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের হুমকি দিচ্ছে।”
এর পর এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের জন্য ডেপুটি স্পিকার কণ্ঠভোটে দিলে অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে অল্প সংখ্যক মৃদু স্বরে ‘হ্যাঁ’ বলেন।
তখন ফজলে রাব্বী মিয়া, মুজিবুল হক চুন্নু, মহিবুর রহমান মানিকসহ সরকারদলীয় প্রায় সব সংসদ সদস্য এই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার না করে গ্রহণের দাবিতে দাঁড়িয়ে মাইক ছাড়াই বক্তব্য রাখতে শুরু করেন।
এই পর্যায়ে অধিবেশনের সভাপতি শওকত আলীকে কিছুটা অপ্রস্তুত দেখা যায়। মিনিট খানেক হৈ চৈ এর পর ফজলে রাব্বী মিয়াকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন ডেপুটি স্পিকার।
ফজলে রাব্বী সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণের দাবি জানিয়ে ফজলে রাব্বী বলেন, “এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি যদি প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে যারা বিচারের সম্মুখীন হয়েছে, তারা সুবিধা পেতে পারে।”
সংসদ সদস্যরা একযোগে প্রস্তাব গ্রহণের দাবি জানাতে থাকলে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী উঠে দাঁড়ালে শওকত আলী বলেন, “মাননীয় উপনেতা দাঁড়িয়েছেন। তিনি কী বলেন শুনি।”
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরী মাইক পেয়ে প্রস্তাবটি ‘স্থগিত’ রাখার আহ্বান জানালে সংসদ সদস্যরা পুনরায় হৈ চৈ করে ওঠেন।
তখন সাজেদা বলেন, “আমরা প্রত্যাহার করলে রাজাকাররা কী করবে? আমরা এই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করলে রাজাকাররা খুশি হবে।”
এরপর প্রধান হুইপ আব্দুস শহীদ ডেপুটি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “উনি (বেনজীর) প্রত্যাহার করে নিলেও আপনার গ্রহণ করার এখতিয়ার আছে।”
এরপর কথা বলতে দাঁড়ার প্রতিমন্ত্রী কামরুল। তিনি বলেন, “যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে চায়, অবশ্যই তাদের বিচার হওয়া উচিত। সরকারের এই ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই।”
ডেপুটি স্পিকার তখন সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার অনুরোধ করে বলেন, “এটা সংসদের ইচ্ছা, গ্রহণ করবে কি না।”
এই সময়ের মধ্যেই বেনজীরকে নিজেদের কাছে ডেকে নেন সাজেদা চৌধুরী ও আব্দুস শহীদ। কয়েক মিনিট কথা বলে বেনজীর আবার তার আসনে ফিরে যান।
এর মধ্যেই স্পিকার আবদুল হামিদ অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেন। তিনি চেয়ারে বসে সবাইকে শান্ত হতে বলেন।
এরপর স্পিকার বলেন, এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব প্রত্যাহারের প্রস্তাবটি ভোটে দিলে যদি কণ্ঠভোটে পাস না হয় তাহলে তা গৃহীত হবে।
স্পিকার পুনরায় বেনজীরকে মাইক দেন এবং তার কাছে জানতে চান, তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করবেন কি না।
তখন বেনজীর তার মতের বিপরীত অবস্থান নিয়ে বলেন, “আমার এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি ৪০ বছরের পূঞ্জীভূত দুঃখ-বেদনার বহিঃপ্রকাশ। আমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি।”
স্পিকার এরপর প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দিলে উপস্থিত সব সংসদ সদস্যরা হাত তুলে সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলেন। তখন আবদুল হামিদ ‘সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি’ গ্রহণ করার কথা বললে সবাই টেবিল চাপড়ে তা স্বাগত জানান।
সংসদ সদস্যদের চাপে এই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবটি পাসের পর নাটোর-৩ আসনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য জুনায়েদ আহমেদ পলক দেশের সব উপজেলা সদরে একটি করে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রস্তাব আনলে তা সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহণ করে সংসদ।
Keywords/Tags: Crime against humanity, international crime tribunal, international crimes trial, war criminal trial, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যুদ্ধাপরাধের বিচার









Leave your response!