যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মাতামাতি
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী গতকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি এশিয়াটিক সোসাইটিতে এক বক্তৃতার পর বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যারা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করছে তাদের শাস্তি দেয়া হবে। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, বিচারের পথে এভাবে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংসদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
বাংলাদেশে কোন অপরাধের বিচার হবে এবং কোন অপরাধের বিচার বাস্তবত হবে না এর যে কোন ঠিক-ঠিকানা নেই, এটা স্বয়ং আইনমন্ত্রীর এই উক্তি থেকে বোঝা যায়। শুধু তাই নয়, কোন কাজকে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে ও কোন কাজ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার অযোগ্য, এর কোন সুষ্ঠু ধারণাও এ সরকারের আছে বলে মনে হয় না। এসব দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা এখন মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সরকারের শীর্ষস্থানীয় লোকেরা বিশেষত আইনমন্ত্রীর মতো দায়িত্বসম্পন্ন লোকেরা যখন আইন ও বিচার বিষয়ে জগাখিচুড়ি কথাবার্তা বলতে কোন অসুবিধা বোধ করেন না তখন এদিক দিয়ে দেশের পরিস্থিতি যে কত সঙ্কটজনক এটা ভালোভাবেই বোঝা যায়।
যারা যুদ্ধাপরাধী তাদের শাস্তি হওয়া অবশ্যই দরকার। তাদের শাস্তি দেয়ার চিন্তা ও ব্যবস্থা শেখ মুজিবুর রহমান না করলেও এবং বিচারের পরিবর্তে তাদের ছেড়ে দিয়ে, শুধু ছেড়ে দিয়ে নয়, জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো এক নম্বর যুদ্ধাপরাধীকে বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করে, ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে সাদর আতিথেয়তার নিদর্শন স্থাপন করলেও এবং বর্তমানে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিজামীর নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সমঝোতা করে সরকার গঠন করলেও এবং ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত তাদের সরকারের মেয়াদকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নিলেও, এখন আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সব সমস্যার থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তার ব্যবস্থা করতে নিযুক্ত হয়েছে। এটা ভালো কথা। কারণ ক্রাইম বা অপরাধের ব্যাপারটি কখনও তামাদি হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘকাল ধরে এমনকি এখনও পর্যন্ত সেই যুদ্ধে অপরাধীদের বিচারের পথ খোলা আছে। কাজেই ১৯৭১ সালে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, তাদের অপরাধ সময়ের ব্যবধানে তামাদি হয়নি। সেই অপরাধ এখনও অপরাধ হিসেবেই গণ্য এবং তার জন্য সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিকে হঠাৎ করে নিজেদের নতুন সরকারের আমলে এক নম্বর জাতীয় ইস্যু হিসেবে সামনে এনে তা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড করতে থাকার মধ্যে কোন যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু এর কোন যৌক্তিকতা না থাকলেও এভাবেই এখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ সরকার শোরগোল করছে। এর উদ্দেশ্য যে দেশের হাজার রকম সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে রাখা- এ নিয়ে সন্দেহ করার বিশেষ কারণ নেই।
যুদ্ধ এমন জিনিস যা বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা শুরু হলেও সামরিক বাহিনী এবং সামরিক লোকজনই তাতে মূল ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ছিল এক নম্বর যুদ্ধাপরাধী। তার মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালনায় যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার হয়েছিল তাতে একমাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ ছাড়া অন্য সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর লোক। বাংলাদেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার হচ্ছে তাতে সামরিক বাহিনীর লোকজন, অর্থাৎ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কোন লোকজনই নেই। সামরিক বাহিনীর কোন বাঙালি অফিসারও নেই। এর সঙ্গত কারণ এই যে, কোন বাঙালি সামরিক অফিসারই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও সরকারের পক্ষে কাজ করেননি। যে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক অফিসারকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের ভারতীয় বাহিনী নিজের তদারকিতে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের ছিল না। পরেও তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতাও তাদের ছিল না। যদিও শেখ মুজিব ও তার মন্ত্রীরা বারবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবে।
তার কিছুই হয়নি। একদিকে ভারত তার নিজস্ব স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করে এবং অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ভুট্টোর সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী সামরিক অফিসারকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সবই যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পরিবর্তে তাদের ক্ষমা করে দেয়ারই ব্যাপার ছিল, এ নিয়ে কোন সুস্থ ও মতলববিহীন লোকের বিতর্কের অবকাশ নেই।
দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকার পর হঠাৎ ঘুম ভাঙা আওয়ামী লীগ সরকার এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে এতই উদগ্রীব যে, এই বিচার পণ্ড করার চেষ্টা প্রতিহত করতে তারা এখন বদ্ধপরিকর। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাদের জোট শরিকের কেউ কেউ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করায় এবং তার বিরুদ্ধে কথা বলায় আওয়ামী লীগ সরকারের মনে হচ্ছে, এর ফলে এই বিচার বিষয়ে তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে! কিভাবে এটা হতে পারে তা অবশ্য এক রহস্য। কারণ ক্ষমতাসীন সরকার বিচারের ব্যবস্থা করে, ট্রাইব্যুনাল গঠন থেকে শুরু করে যখন সবকিছুই করছে তখন বিচার সম্পর্কে কিছু লোক কী মন্তব্য করছে বা কথা বলছে এ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার বা একে ‘প্রতিহত’ করতে যাওয়ার মধ্যে কোন বাস্তবসম্মত যুক্তি নেই।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর ওপরে উদ্ধৃত মন্তব্যে ফিরে গিয়ে একথা বলা দরকার যে, সংসদে আওয়ামী লীগ সরকার যে প্রস্তাব পাস করেছে এবং আইনমন্ত্রী নিজেও যুদ্ধাপরাধ ঠেকানো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার যে কথা বলেছেন ও যেভাবে বলেছেন, তার মধ্যে গণতন্ত্রের ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কোন স্থান নেই। যে কোন লোক সরকার বা সরকারের কোন নীতি বা কাজের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশদ্রোহী বলা একমাত্র একটা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাতেই সম্ভব। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার নাম করে যদি সরকার অহেতুক স্পর্শকাতরতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিষয়ে সব কথাবার্তা বন্ধ করতে চায়, তাহলে তার দ্বারা বিচারের ব্যাপারে তাদের আগ্রহের থেকে বিরোধী দলের প্রতি প্রতিশোধস্পৃহার প্রমাণই বেশি পাওয়া যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেভাবে হচ্ছে, এ প্রক্রিয়া এবং এর ত্রুটি-বিচ্যুতি বিষয়ে শুধু জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপিই নয়, অন্য যে কোন সাধারণ নাগরিক প্রশ্ন তুলতে পারেন, কথা বলতে পারেন। এ নিয়ে হুলস্থূল প্রতিবাদ এবং এর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস ও আইন করার কিছু নেই।
আসলে আওয়ামী লীগ এখন যেসব কাজ একের পর এক করে চলেছে তার মধ্যে স্থিতিশীলতার পরিবর্তে দেশকে আরও অস্থিতিশীল করার কাজই বেশি হচ্ছে। অনেক অপ্রাসঙ্গিক ও নিষ্প্রয়োজনীয় ইস্যুকে সামনে এনে তারা যেভাবে মাতামাতি করছে, এর মধ্যে তাদের শক্তির থেকে ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হতে থাকার লক্ষণই বিশেষভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
Keywords/Tags: আওয়ামী লীগ সরকারের মাতামাতি, বদরুদ্দীন ওমর, যুদ্ধাপরাধের বিচার









Leave your response!