Home » BD News 24, Bangladesh, Bangladesh 1971 Trials, Bengali, Crimes Against Humanity, Dhaka, Due Process & Trial Standards, International Crimes trial, News, Report, Transparency, War Crimes Trial, কালের কন্ঠ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পা রাখল তিন বছরে : রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতায় ধীরগতি

25 March 2012 Author: আহমেদ দীপু ও আশরাফ-উল-আলম Original Source: Link

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বছর পূর্ণ করে আজ ২৫ মার্চ রবিবার তৃতীয় বছরে পা দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীরই বিচার শেষ হয়নি। একজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানি চলছে। কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।
অমার্জনীয় অপরাধগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার এই ধীরগতির জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন অনেকটা দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে গাফিলতি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র যথাযথ না হওয়া, নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারা, মামলার সাক্ষী হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার মতো ঘটনাগুলোর কারণেই এসব অভিযোগ উঠছে। আর ওই সব ঘটনার কারণে ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা পর্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনাল প্রথমে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়, সেগুলো সুবিন্যস্ত ও শ্রেণীভুক্ত ছিল না, ছিল অগোছাল। একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনা মিলিয়ে ফেলা হয়েছিল। তারিখ ঠিক ছিল না। তাই সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উল্লেখ করে নতুনভাবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন আদালত। আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ এবং মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগপত্রেও একই ধরনের সমস্যা ছিল। সেগুলোও সংশোধনের জন্য ট্রাইব্যুনাল ফেরত পাঠিয়েছে। আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগপত্রে নিহতদের নামের তালিকা দেওয়া হয়নি। সাক্ষীর নামও দেওয়া হয়নি। একটি হত্যাকাণ্ডে কাদের মোল্লার উপস্থিতির কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না। আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল গত ১২ জানুয়ারি। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ সেদিন তা জমা দিতে পারেনি। পরে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ছয়বার সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবার গত বছরের ২০ নভেম্বর। এর পর থেকে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি, ১৮ জানুয়ারি, ২৪ জানুয়ারি, ৭ ফেব্রুয়ারি ও ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে ৭ ফেব্রুয়ারি সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হলে এদিন ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেন। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তার মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি। এমনকি এই অপরাধের জন্য তাঁকে সরাসরি অভিযুক্তও করা হয়নি। নিজামীকে বুদ্ধিজীবী হত্যায় সরাসরি অভিযুক্ত না করায় ট্রাইব্যুনাল বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার থমকে আছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানিও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। গোলাম আযম, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপন করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগেও ভুলত্রুটি থাকায় ফেরত দিতে হয়েছে ট্রাইব্যুনালকে। এসব কারণে তদন্ত শেষ করার পরও দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত এসব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হয়নি।
এই বিচারকাজ চলাকালে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের ভূমিকায় ট্রাইব্যুনালকে বারবার অসন্তুষ্ট হতে দেখা গেছে। এমনকি মামলার সঠিক তদন্ত হচ্ছে না বলেও বিচারকদের বলতে শোনা গেছে।
তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশনের গাফিলতির কারণে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে- এ অভিযোগের কথা তুললে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, উপমহাদেশে এ ধরনের বিচার এই প্রথম হচ্ছে। এই বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিচারক, তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের সদস্যরা এ ধরনের কাজে নতুন। তার পরও সবাই যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, মামলার শুনানির সময় বিচারকরা আইনজীবীদের নানা ধরনের কোয়ারি করে থাকেন, এটা নিয়ম। ট্রাইব্যুনালের বিচারকরাও প্রসিকিউশনের কাছে সে ধরনের কোয়ারিই করছেন। এতে মামলার ক্ষতি হবে- এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এই মামলায় কারাগারে আটক বন্দিদের বিচার এ বছরই শেষ হবে বলে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, বিলম্বের জন্য গাফিলতির চেয়ে অনভিজ্ঞতাই প্রধান কারণ। সংশ্লিষ্টদের অনভিজ্ঞতার কারণেই বিচারকাজ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তাই সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে অপরাধীরা। তিনি আরো বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশনের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের গাফিলতি বা অনভিজ্ঞতার চেয়ে আবার সরকারের নীতিনির্ধারকদের সীমাবদ্ধতা দায়ী অনেক বেশি। অপরাধীদের বিচারে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু এই বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সে সম্পর্কে সরকারের ধারণা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এটা। তাই এটা একটা বিশাল যজ্ঞ বলা যায়। এ জন্য গবেষণা প্রয়োজন। আমরা প্রথম থেকেই গবেষণার বিষয়ে বলে আসছি, কিন্তু সরকার সেদিকে নজর দিচ্ছে না। এর পরিণতি এখন টের পাওয়া যাচ্ছে। সাত-আটজন অপরাধীর বিচার করার জন্য কমপক্ষে ২৫ জন আইনজীবী প্রয়োজন। সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৩ জন। তাঁদের সবাই আবার অফিস করেন না। এর পাশাপাশি আইনজীবীদের নিরাপত্তা নেই, সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না। সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা আইন করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা তৈরি করা হয়নি, যে কারণে সাক্ষীরা ভয় পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সংশ্লিষ্ট সবার ষোল আনা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।’
তদন্তে গাফিলতি ধরা পড়েছে, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে; তদন্তের এই গাফিলতির দায় কার- প্রশ্ন করা হলে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, গাফিলতির প্রসঙ্গ যেখান থেকেই উঠুক না কেন, এ অভিযোগ যথাযথ নয়। তিনি বলেন, ‘একে তো এত বছর আগের ঘটনা, তার ওপর এমন অপরাধের বিচার হচ্ছে যা এ দেশে নতুন। তাই দু-একটি ক্ষেত্রে অপরাধগুলো যথাযথভাবে বা গুছিয়ে উপস্থাপন করা যায়নি। এটা গাফিলতি নয়। ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে বলেছি, বিচারকালে যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে আমরা অপরাধ প্রমাণ করার চেষ্টা করব।’
দুই বছরেও একজনের বিচার সম্পন্ন না হওয়ার কারণ কী- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৪০ বছর আগের অপরাধ। এই ৪০ বছর বাংলাদেশে যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল তার অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ছিল না। এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অনেক দলিলপত্র ধ্বংস করা হয়েছে। তাই এখন সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে বেগ পেতে হচ্ছে। অনেক ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে বিদেশে যেতে হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশ থেকে ডকুমেন্ট আনতে সময় লেগেছে। তিনি বলেন, ৪০ বছর আগের অপরাধ হওয়ায় সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষী মারা গেছেন। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য এ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। তাই সাক্ষী সংগ্রহ করতেও সময় লেগেছে। তিনি বলেন, এসব সাক্ষী ও ডকুমেন্ট সংগ্রহের পর বিচারকাজ শুরু হয়েছে। এখন বিচার ত্বরান্বিত হবে।
তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেরি নয়, তাড়াহুড়োর কারণে নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আরো সময় নিয়ে কাজ করতে পারলে ফল আরো ভালো আসত।’
আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারা সম্পর্কে আবদুল হান্নান খান বলেন, ‘কোনো মামলাতেই সব সাক্ষী হাজির হন না। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে যাঁরা সাক্ষ্য দেবেন, তাঁদের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এটা আমরা আদালতকে জানিয়ে দিয়েছি।’
আবদুল হান্নান বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনের ১৯(২) ধারায় বলা আছে কোনো সাক্ষীর মৃত্যু হলে, বয়স বেশি হলে, হাজির হতে না চাইলে বা বিদেশে থাকেন; আসতে না পারলে তদন্ত কর্মকর্তা ওই সাক্ষীর যে বক্তব্য রেকর্ড করেছেন তা আদালত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে। ২০০৯ সালে আইন সংশোধনের পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ হাইকোর্টের বিচারপতি নিজামুল হককে চেয়ারম্যান করে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। পুরনো হাইকোর্ট ভবনে এ ট্রাইব্যুনাল বসার পর জামায়াত নেতা গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা এবং বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তদন্ত চলাকালেই তাঁদের আটক করা হয়। একমাত্র আবদুল আলীম বাদে বাকিরা এখন কারাবন্দি।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত একমাত্র সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। বাকি সাতজনের মধ্যে কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠন করা যায়নি। সাঈদীর বিরুদ্ধে ২৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের পর এখন রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত সাক্ষী পাচ্ছে না। আদালতে লিখিতভাবে সাক্ষী না পাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। এখনো সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য শেষ হয়নি।
গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাকা চৌধুরী, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) বিচারের জন্য আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে।

Keywords/Tags: , , , , , ,

Added by: abishchruto

Comments are closed.