বিদেশিদের সম্মাননা প্রদান : কৃতজ্ঞতা ও মহত্ত্বের উচ্চতা প্রমাণের স্বাক্ষর
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায়। স্বাধীনতা এই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের মহান স্বাধীনতা ৪১ বছর পূর্ণ করল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রত্যয় এই জাতিকে দিয়েছিল গৌরবোজ্জ্বল এক নিশানা। বিপুল রক্ত খরচ আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের অহংকারও। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেউ কেউ গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ার বলতে চেয়েছেন, যা চরম আপত্তিকর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই সত্যের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই।
সুমহান মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক বিদেশি নাগরিক। আলোচিত ওইসব মানুষের কাছে আমাদের ঋণ অপরিসীম। দাঁড়িয়েছিল কিছু রাষ্ট্র এবং সংগঠনও। তাদের প্রতিও আমাদের কৃতজ্ঞতা অশেষ। বিলম্বে হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঋণ স্বীকার করে তাঁদের সম্মাননা জানানোর যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, তা প্রশংসনীয়, অভিনন্দনযোগ্য। আজ ২৭ মার্চ ২০১২, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয়ভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১৩২ জনকে সম্মাননা জানানো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকা মতে, সম্মাননাপ্রাপ্তদের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে তাঁদের সবাইকে একইভাবে সম্মানিত করা হবে। এই মহতী উদ্যোগের জন্য আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। এই বীর সেনানীদের প্রতিও রইল আমাদের রক্তিম অভিবাদন ও শুভেচ্ছা। এই অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এমন একটি মহতী অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিভেদের রাজনীতির প্রাচীর ভেঙে সূচনা হবে নবদিগন্তের। এ ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সব পক্ষশক্তিরও দায় রয়েছে। আমরা এও মনে করি, বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানাতে পেরে আমরা আমাদের মহত্ত্বের উচ্চতা প্রমাণেই সফল ও সার্থক হয়েছি। আবারও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞ নই। আজকের বাংলাদেশে একাত্তরের সেই কঠিন সময় অতিক্রম না করা প্রজন্মের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু তাদেরও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানুষদের মতো দিগন্তবিস্তৃত স্বপ্ন আর অসীম সাহস। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই প্রজন্মের সামনে বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করার অপচেষ্টা হয়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। কিন্তু আমার কথা হলো, তাদের অচেতন করে রাখার সব রকম অপপ্রয়াস সত্ত্বেও তারা যথেষ্ট সচেতন এবং প্রকৃত ইতিহাসসন্ধানী। বিদেশি বন্ধুদের জাতীয়ভাবে সম্মাননা জানানোর এই প্রয়াস আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করবে- এও আমাদের প্রত্যাশা। এমনটি দেশ-জাতির জন্য অপরিহার্যও বটে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী অনেক বিদেশি বন্ধুর ইতিমধ্যে প্রয়াণ ঘটেছে। সম্মাননা জানানোর জন্য নির্বাচিত প্রয়াতদের পক্ষে তাঁদের প্রতিনিধিরা এসেছেন তা গ্রহণ করতে। এসব প্রতিনিধি এবং জীবিত যাঁরা এসেছেন সম্মাননা গ্রহণ করতে, গণমাধ্যমে আমরা তাঁদের আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়া জানতে পারছি। অনেকেই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বাংলা ভাষায় উচ্চারণে তাঁরা স্মরণ করেছেন সেই গৌরবোজ্জ্বল ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। একটি দেশের জন্মলাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিকে তাঁরা সৌভাগ্য ও গর্ব বলে জানিয়েছেন। এই বিদেশি বন্ধু-সুহৃদদের আজও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যে শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে, তা থেকে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। আবারও তাঁদের প্রতি রইল আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে সরকারকে জানাই সাধুবাদ।
Keywords/Tags: 1971, বিদেশিদের সম্মাননা, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১









Leave your response!