TwitterFacebook

হুমায়ূন আহমেদ, দেয়াল এবং দায়মুক্তি…

হুমায়ূন আহমেদ ঠোঁটকাটা লোক। বেস্ট সেলার তালিকায় ধারাবাহিক অধিষ্ঠানের সময়ই এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন যে, তিনি টাকার জন্য লেখেন। তিনি গল্প বলেন, গল্প লোকে পছন্দ করে, সে গল্পের তুমুল কাটতি। ব্যাপারটা এ পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু গোল বাধলো যখন তিনি ইতিহাস নিয়ে গল্প বানাতে শুরু করলেন।

একাত্তরভিত্তিক তার অনেক বইয়ের একটি ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই উপন্যাসে অনেক চরিত্র ঐতিহাসিক; তাদের অস্তিত্ব এখনও জাজ্বল্যমান আমাদের চেতনায়। হুমায়ূনের পাঠকশ্রেণী ওই নন-ফিকশনাল ফিকশনের তফাৎটা ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা এটাকে সত্যিকার ইতিহাস মেনেছেন। এর মধ্য দিয়ে হুমায়ূন একটি চরম বিতর্কিত কাজ করেছেন যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে গেছে।

প্রথমত তিনি উল্লেখ করেছেন ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছেন। এটি প্রমাণিত মিথ্যাচার। এর স্বপক্ষে কয়েকজন ঘুনেধরা রাজনীতিক এবং স্বাধীনতাবিরোধী বুদ্ধিজীবী ছাড়া কারো সোচ্চার দাবি নেই। এবং তারা এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেন নি। সেই সমাবেশে উপস্থিত আরো লাখো শ্রোতার কেউ তাদের এই দাবির সত্যতাকে সমর্থন করেননি। দ্বিতীয় যে অন্যায়টি করেছেন, তা তার সেই উপন্যাসের খলচরিত্রটির যাবতীয় অপকর্ম (পাকবাহিনীর সহযোগী হিসেবে) বর্ণনার পরও তার জন্য একটা সফট কর্নার তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। সুবাদে যা দাঁড়িয়েছে তার ফলে পাঠকদের একটা বড় অংশ শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মানে; কারণ হুমায়ূন লিখেছেন শেখ মুজিব নাকি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছেন তার ভাষণে।

অন্যদিকে রাজাকারিতার চূড়ান্ত করার পরও সেটা যে নিতান্তই পরিস্থিতির চাপে করা হয়েছে এমন একটা ধারণারও জন্ম দিয়েছেন হুমায়ূন। অনলাইন ফোরামগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-বিকৃতি রোধে আমাদের যে নিত্য লড়াই, তাতে বিপক্ষ শক্তির একটা বড় অবলম্বন এখনও ‘জোছনা ও জননীর গল্প’।

হুমায়ূন ক্যান্সার আক্রান্ত, চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যেই তিনি ঘোষণা দিয়ে লিখছেন ‘দেয়াল’ নামে একটি উপন্যাস। এটিও রাজনৈতিক উপন্যাস, এবং এর পটভূমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড। এ বিষয়ে এরই মধ্যে প্রমোশনাল কাজকর্ম চলছে। একটি পত্রিকা তার সেই প্রকাশিতব্য উপন্যাসের দুটো অধ্যায় ছাপিয়েছে। সঙ্গে তাদের পোষা বুদ্ধিজীবীদের একজনকে দিয়ে একটি সম্পূরক লেখা ছাপিয়েছে এর ঐতিহাসিক সত্যতা ও মানগত উৎকর্ষের সমর্থনে।

শুক্রবার গোটা দিনটিই ফেসবুক এবং ব্লগগুলো উত্তাল ছিলো এই নিয়ে। কারণ হুমায়ূন আবারও ইতিহাস-বিকৃতি ঘটিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ডটির পরই এই দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অধিষ্ঠান ঘটে। রাতারাতি না হলেও ধীরে ধীরে, অনেক বছর ধরে। সে সময়টাতে এই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে যেসব অপপ্রচার চলে সেসবেরই একটি ছিলো হত্যাকারীরা সব মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নাটের গুরু খন্দকার মোশতাক আহমদ তাদের `সূর্যসন্তান` আখ্যা দিয়ে রীতিমতো ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ পাস করিয়ে নেয় যাতে এই খুনীদের কোনোরকম আইনি ঝামেলায় পড়তে না হয়। তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

হুমায়ূনের দেওয়া দায়মুক্তিও সেই অধ্যাদেশের আদলেই হয়েছে। প্রকাশিত ওই নির্বাচিত অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন: … মেজর ফারুক দলবল নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জঙ্গলে। তাঁর শীতকালীন রেঞ্জ ফায়ারিংয়ের শিডিউল। মার্চ মাসে শীত নেই। চামড়া পোড়ানো গরম পড়েছে। সকালবেলা মাঝারি পাল্লার কামানে কয়েক দফা গুলি চালানো হয়েছে। জওয়ানরা তাঁর মতোই ক্লান্ত। তিনি সুবেদার মেজর ইশতিয়াককে ডেকে বললেন, আজকের মতো ফায়ারিং বন্ধ।

ইশতিয়াক বলল, স্যারের কি শরীর খারাপ করেছে?

ফারুক বললেন, আই অ্যাম ফাইন। গেট মি এ গ্লাস অব ওয়াটার।

তাঁর জন্য তৎক্ষণাৎ পানি আনা হলো। পানির গ্লাসে বরফের কুচি ভাসছে। ফারুক গ্লাস হাতে নিয়েও ফেরত পাঠালেন।
ইশতিয়াক বলল, স্যার, পানি খাবেন না?

ফারুক বললেন, না। একজন সৈনিক সর্ব অবস্থার জন্য তৈরি থাকবে। সামান্য গরমে কাতর হয়ে বরফ দেওয়া পানি খাবে না।
বরফ ছাড়া পানি নেই?

না। মুক্তিযুদ্ধের সময় একনাগাড়ে দুই দিন পানি না খেয়ে ছিলাম।

ইশতিয়াক বলল, পানি ছাড়া কেন ছিলেন, স্যার? বাংলাদেশে তো পানির অভাব নেই।

যেখানে ছিলাম, সেখানে সুপেয় পানির অভাব ছিল। সবই পাটপচা নোংরা পানি। ভাগ্যিস, পানি খাইনি। যারা খেয়েছিল, তারা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সেবার আমাদের হাতে অল্পবয়সী একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ধরা পড়েছিল। তার সঙ্গে ছিল বোতলভর্তি পানি। দাঁড়াও, তার নামটা মনে করি। এস দিয়ে নাম। ইদানীং কেন যেন পুরোনো দিনের কারোর নামই মনে পড়ে না। যাক, মনে পড়েছে। শামস। রাজপুত্রের মতো চেহারা। মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডে খুঁত থাকলেও তার কোনো খুঁত ছিল না। খাঁড়া নাক, পাতলা ঠোঁট, মাথার চুল কোঁকড়ানো, আবু লাহাবের মতো গায়ের রং।…

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, সেনাবাহিনীর দলিলপত্র, কোথাও ফারুক রহমান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত নন। তিনি কলকাতায় রিপোর্ট করেছেন ১২ ডিসেম্বর। তখন ঢাকা-কিশোরগঞ্জ-খুলনা বাদে প্রায় পুরো দেশই স্বাধীন। বিজয়ের চারদিন আগে তাকে আর যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কষ্ট করতে হয়নি। নভেম্বরে যোগ দিয়েছিলেন তারই ভায়রাভাই এবং খুনের সহযোগী কুচক্রী কর্নেল রশীদ। হুমায়ূন এই ফারুককে দিয়ে রূপবান একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে হত্যা করিয়েছেন, যে ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে প্রচুর ধর্ষণের অভিযোগ এবং সেসব ধর্ষণে সে বিকৃত মানসিকতার নজির রাখতো। দুদিন পানি না খেয়ে থাকা ফারুকের জীবন বাঁচানোর পরও সে তাকে মারতে দ্বিধা করে না। তো ফারুক একজন টাফ গাই, নীতিবান মুক্তিযোদ্ধা! এইভাবেই মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে একজন কুখ্যাত খুনীর প্রতি তার সরল পাঠকদের মধ্যে মমতার বোধ জাগানোর অপপ্রয়াস নিয়েছেন হুমায়ূন।

বিকৃতি আরো আছে। এর মধ্যে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকেও টানা হয়েছে যেন হাটহাজারির ঘটনা মাসকারেনহাসকে বলেছেন ফারুক। এই পুরা টুইস্টটা আমাদের ইতিহাসের জন্য একটা বিপজ্জনক বার্তা। কারণ এই দেশের রাজনীতি এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তিতে বিভক্ত। সেই বিভক্তিতে এই বিকৃতি একটি ভয়ংকর উপাদান হয়ে শক্তিশালী করবে স্বাধীনতাবিরোধীদের যাবতীয় অপপ্রচারকে। অল্পতেই বিভ্রান্ত উঠতি প্রজন্ম এদের যাবতীয় মিথ্যাচারকেই সত্য ভাববে।

যে প্রকাশনী ও যে পত্রিকাটির তরফে হুমায়ুন এত লাইমলাইট পাচ্ছেন তাদের অভিসন্ধি এই সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে গত ক’বছর ধরেই সন্দেহজনক। সম্প্রতি অদিতি ফাল্গুনী নামে এক লেখিকা এক কল্পিত মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরিকে উপন্যাস বানিয়ে ইচ্ছামতো স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিকৃত উপস্থাপন করে সেই পত্রিকা-প্রবর্তিত পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। সেই পত্রিকায় কর্মরত একজন নামী লেখকও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন এবারের বইমেলায় এবং তিনিও বিভ্রান্তির কৌশল নিয়েছেন। তো পরিকল্পিত এই প্রোপাগান্ডায় সর্বশেষ অন্তর্ভুক্তি হুমায়ূন।

এই বই লিখে হুমায়ুন কি তার চিকিৎসাব্যয়ের নির্ভরতা পাবেন? স্রেফ টাকার জন্য একটা দেশের ইতিহাসের বিকৃতিতে ভূমিকা রাখবেন? প্রশ্নগুলো উঠছে, কারণ ঘটনাক্রম তা সমর্থন করছে। হুমায়ুন আমাদের সেরা সম্পদদের একজন, কিন্তু তিনিও যদি নিজেকে এভাবে বিকিয়ে দেন তখন আমাদের আস্থার জায়গাগুলো বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ভক্তদের একাংশ তার হয়ে লড়েছেন আমাদের অভিযোগের বিপরীতে। তাদের কথা কয়টা অধ্যায় পড়েই আমরা অতিরিক্ত স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছি। পুরোটার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। রাজনৈতিক কেউ কেউ তো বললেন, আরে মেনে নেন এটুকু, সামনে জিয়াকে ধুয়ে দিয়েছে, ভাসানী ওসমানী কেউ বাদ পড়েনি! এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। অন্যায় হচ্ছে, মিথ্যাচার হচ্ছে, বিকৃতি হচ্ছে তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ মিলেছে, প্রমাণ দিয়েই তা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ভাত সেদ্ধ হলো কিনা সেটা জানতে গোটা হাঁড়ি হাতাতে হয় না, দুয়েকটা চাল টিপলেই যথেষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Archive I: Media Archive

Archives news reports, opinions, editorials published in different media outlets from around the world on 1971, International Crimes Tribunal and the justice process.

Archive II: ICT Documentation

For the sake of ICT’s legacy this documentation project archives, and preserves proceeding-documents, e.g., judgments, orders, petitions, timelines.

Archive III: E-Library

Brings at fingertips academic materials in the areas of law, politics, and history to facilitate serious research on 1971, Bangladesh, ICT and international justice.

Archive IV: Memories

This archive records from memory the nine-month history of 1971 as experienced and perceived by individuals from all walks of life.

Partners

Website Sections

External Resources

Tools

About Us

Follow Us