সাকা চৌধুরী পরিচিত ছিলেন পাকিস্তানি মেজর হিসেবে : ড. আনিসুজ্জামান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে: বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে কাজ করেছেন। এসময় তিনি পাকিস্তানী মেজর হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
একথা বলেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে সোমবার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন ড. আনিসুজ্জামান।
সোমবার ১০টা ৪৭ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির প্যানেল এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন। দুপুর ১২টার কিছু সময় পর পর্যন্ত দেওয়া সাক্ষ্যে ড. আনিসুজ্জামান ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের তথা সারা দেশের ভীতিকর পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
পরে শুরু হয় ড. আনিসুজ্জামানের জেরা। সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম তার জেরা শুরু করেন। দুপুর সোয়া ১টার দিকে আদালত মুলতবি করা হয়। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় ড. আনিসুজ্জামানকে সাকার আইনজীবীর জেরা দিয়েই আদালতের কার্যক্রম শুরু হবে।
এর আগে আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগেই সাকা চৌধুরী আদালতে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, “গোল পোস্ট এক জায়গায় থাকবে তো, নাকি সাক্ষ্য শুরু হলে আবার দৌড়াবে?“
তখন ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক হাসি মুখে বলেন, “দেখে যান সবকিছু।“
অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তার সাক্ষ্যে বলেন, “একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী পাকিস্তানী মেজর হিসেবে পরিচিত ছিলেন ।”
দীর্ঘ সাক্ষ্যে আনিসুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্ভর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। আমি ৭২ সালের ৬ জানুয়ারি প্রথমে খুলনায় এবং ৮ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসি। এরপর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব পদে যোগদান করে বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করি।’
সাক্ষ্যে ড. আনিসুজ্জামান চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলেন, “চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার পর আমি নূতন চন্দ্র সিংহের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কুণ্ডেশ্বরীতে যাই। তখন তার কনিষ্ঠ ছেলে প্রফুল্ল চন্দ্র সিংহ আমাকে জানায়, পাকিস্তানী সেনারা ১৩ এপ্রিল কুণ্ডেশ্বরীতে প্রবেশ করে। এসময় ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সেনাবাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। তখন তারা নতূন চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে ফিরে যাওয়ার সময় সাকার ইঙ্গিতে পাকিস্তানী বাহিনী নতূন চন্দ্রকে টেনেহিঁচড়ে বাসা থেকে বের করার পর গুলি করে। পরবর্তীতে মূমুর্ষূ নতূন চন্দ্রকে সাকা চৌধুরী তার পিস্তল দিয়ে গুলি করে। এতে তার মৃত্যু হয়। প্রায় তিনদিন তার মৃতদেহ সেখানে পড়ে ছিল। পরে স্থানীয় অধিবাসীদের সাহায্যে তার সৎকার করা হয়।”
ড. আনিসুজ্জামান বলেন, “ওই সময় সাকা চৌধুরী পাকিস্তানী মেজর বলেই পরিচিত ছিলেন।”
আনিসুজ্জামান তার জবানবন্দীতে আরও বলেন, ‘আমি আরেকটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে ৭১ সালের কোনো এক সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সালেহ উদ্দিনকে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। তাকে চট্টগ্রামের ফজলুল কাদেরের বাড়ি গুডস হিলে আটকিয়ে রাখ হয়। সেখানে সাকা চৌধুরী ও অন্যান্যরা তার ওপর নির্মম অত্যাচার করে। সালেহ উদ্দিন পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় সিনেটের এক অধিবিশনে ওই অত্যাচারের কথা জানান। আমরা দেখেছি তখনও তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন ছিল।”
“অধ্যাপক সালেহ উদ্দিন বর্তমানে সিলেটের শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য,” উল্লেখ করেন ড. আনিসুজ্জামান।
সোমবার সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনাল-১-এ হাজির করা হয়। সাড়ে ১০টার দিকে আদালতে আসেন ড. আনিসুজ্জামান।
এর আগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম ৭ মে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য শেষ করেন। যা শুরু হয় গত ৩ মে।
উল্লেখ্য, একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন, ধর্মান্তরকরণসহ ২৩টি অপরাধের দায়ে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
এ নিয়ে ৪১ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে সংঘটিত অপরাধের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে তিনজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এর আগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং ১৩ মে রোববার জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই করে দেখা গেছে, তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), ৪ (১ ও ২) (সি), ৩(২)(জি) এবং ৩(২)(এইচ) ধারায় অপরাধ করেছেন।
তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও অপরাধে সহায়তা করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। গত ৪ এপ্রিল বিচারপতি নিজামুল হক ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৩টি অভিযোগ পড়ে শোনান।
চার্জ গঠনের পর প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)-এর এ, সি, জি এবং এইচ ধারা অনুসারে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল থেকে আগস্ট এই পাঁচ মাসে রাউজানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ৪৩৭ ব্যক্তির হত্যার সঙ্গে জড়িত সাকা চৌধুরী।
তার বিরুদ্ধে রাউজানের শাকপুরা, ঊনসত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। শুধু রাউজানেই ৯টি গণহত্যা চালানো হয়। মূলত, হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিশ্চিহ্ন করতে এসব হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
বলা হয়, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট যে ২৩টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয় সেগুলোতে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে সাকা চৌধুরীদের গুডস হিলের বাসভবনকে টর্চার সেন্টার করা হয়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী লোকজন, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারীদের ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। সাকার নিজের এলাকা রাউজানের ডা. নূতন চন্দ্র সিংহ ও মধ্য গহিরার ডা. মাখনলাল শর্মাসহ গহিরা বিশ্বাসপাড়া, জগৎমল্লপাড়া, ঊনসত্তরপাড়াসহ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৬ জুলাই সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে গ্রেফতারের জন্য ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে তদন্ত সংস্থা। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর ভোররাতে বনানীর একটি বাসা থেকে অপর একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এটি ছিলো হরতালের আগে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মামলা। পরে তাকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ৪ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। ৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে ১ হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সময় ১৩২০ ঘণ্টা, মে ১৪, ২০১২
Keywords/Tags: 1971, bnp, Crime against humanity, international crime tribunal, saka chowdhury, war criminal trial, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, বিএনপি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সাকা চৌধুরী, ১৯৭১









Leave your response!