সৌদি আরবের পত্রিকায় অপপ্রচার : মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার মুসলিমবিরোধী!
একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে ‘মুসলিমবিরোধী’, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ’ ও ‘অযৌক্তিক’ প্রমাণ করতে তৎপরতা চালাচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশি বন্ধুরা। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে এ বিচার সম্পর্কে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি এ কাজে তারা ব্যবহার করছে ফেসবুকের মতো সামাজিক গণমাধ্যম এবং একাধিক ভাষার ওয়েবসাইটও। সৌদি আরবের এক সাবেক কূটনীতিক গতকাল বুধবার সে দেশের একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় এক নিবন্ধে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগকে ‘অবিশ্বাস্য’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেদ্দা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক সৌদি গেজেটে গতকাল সম্পাদকীয় পাতায় অভিমত কলামে লেখাটি ছাপা হয়েছে। ‘লেটার টু শেখ হাসিনা’ (শেখ হাসিনাকে চিঠি) শিরোনামে এটি লিখেছেন সাবেক সৌদি কূটনীতিক ড. আলী আলগামদি।
চিঠিতে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে আলী আলগামদি লিখেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ষাটের দশকে তিনি সৌদি কূটনীতিক হিসেবে চট্টগ্রামে হজযাত্রীদের ভিসা দেওয়ার কাজ করেছেন। আশির দশকেও তিনি ঢাকায় সৌদি দূতাবাসে দায়িত্বে ছিলেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও সৌদি-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির মহাসচিব হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে সাহায্য করেন বলে তিনি দাবি করেন।
ড. আলী আলগামদি বাংলাদেশে সৌদি দূতাবাসে দায়িত্ব পালনের সময় ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে সৌদি গেজেটের অন্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।
নিবন্ধে আলী আলগামদি দাবি করেন, শেখ হাসিনা তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত’ বাতিল করে যুদ্ধাপরাধের ইস্যুটি আবার সামনে আনায় সবাই বিস্মিত হয়েছে। তিনি আরো দাবি করেন, শেখ হাসিনার আগের মেয়াদে এবং তাঁর বাবার মেয়াদে যেসব ‘মুসলিম নেতা’ গ্রেপ্তার হননি, তাঁদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত কোনোভাবে ন্যায়সংগত হতে পারে না। শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ওই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য ভালো কিছু আনতে পারে না। এটি জনগণকে বিভক্ত করবে এবং দুর্ভোগ বাড়াবে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের নেতা হিসেবে আপনার (শেখ হাসিনা) ওপরও পড়বে।’
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে ভালোবাসেন বলে দাবি করে ড. আলী আলগামদি বলেন, গোলাম আযমের মতো ‘মুসলিম নেতাদের’ গ্রেপ্তার করায় ‘গোটা মুসলিম বিশ্ব হতাশ।’ তিনি এ-ও দাবি করেন, ৪০ বছর আগের ঘটনার জন্য গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
লেখাটিতে অনেক তথ্যগত ভুল রয়েছে। আলী আলগামদি লিখেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধ’ আইনসহ বেশ কিছু আইন করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ‘যুদ্ধাপরাধ’ আইনের বলে নাকি ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেওয়া হয়েছিল! পরে ওই ১৯৫ পাকিস্তানিকে ক্ষমা করে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নাকি মুসলিম বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। আলী আলগামদি বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগীদের বিচারের জন্য আইন পাস করার পর এক লাখেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তিদের কেউই নাকি রাজনীতিক ছিলেন না!
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে আগেও সৌদি সংবাদমাধ্যমে লিখেছেন ড. আলী আলগামদি। গত ৯ মে সৌদি গেজেটে তিনি গোলাম আযমকে গ্রেপ্তারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জানা গেছে, এ বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে নানারকম অপপ্রচার চলছে। ‘জামায়াত নেতাদের মুক্তি আন্দোলন- রাজনৈতিক এই নিপীড়ন মানবতাবিরোধী’, ‘ফ্রি জামায়াত লিডারস’ নামে ওয়েবসাইট খুলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া গোলাম আযম ডট নেট নামে আরেকটি ওয়েবসাইট রয়েছে, যাতে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় তথ্য প্রচার করা হয়।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় অনেক সময় যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি আসে। একটি মহল বিদেশিদের এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দিচ্ছে। এটি উদ্বেগের। সৌদি গেজেটে ড. আলী আলগামদির লেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব বিদেশে আমাদের প্রধান শ্রমবাজার। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে এমন প্রচারণায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ওই লেখায় এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিচ্ছেন। এটা যে আদালত ও আইনের আওতায় হচ্ছে, তা প্রচারের সুযোগ রয়েছে।’
ওই কূটনীতিক বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার স্পর্শকাতর হলেও আসলে কী হচ্ছে তার কিছুটা হলেও যদি বিদেশিদের জানার সুযোগ থাকে, তাহলে উদ্বেগ বা অপপ্রচার অনেকটাই কমবে।’
Keywords/Tags: Crime against humanity, international crimes trial, Propaganda, war crimes trial, war criminal trial, অপপ্রচার, ড. আলী আলগামদি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইবুনাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সৌদি গেজেট









Leave your response!