TwitterFacebook

জামায়াত ইসলামীকে কেন যুদ্ধাপরাধীদের দল বলা যাবে না?

Author : সুলতান মির্জা
Source : http://blog.bdnews24.com/nolihatabd/94036

খুব অবাক হয়ে যাই যখন জামায়াত কে যুদ্ধাপরাধী বললে তারা এটার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে। বিভিন্ন ভাবে তর্ক করে। না বলে পারি না, যারা এই সব তর্কের সাথে জড়িয়ে নিজেকে সব জান্তা হিসেবে প্রকাশ করতে চায় তাদের অনেকেরই জন্ম স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে। তো যাই হোক প্রিয় পাঠক-পাঠিকা আপনারা সকলেই জানেন বর্তমানে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য শুরু হয়েছে। হয়তো বা আগামী ডিসেম্বরের আগে বেশ কিছু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য শেষ হয়ে যাবে। সেই জন্য ধন্যবাদ জানাই বর্তমান মহাজোট সরকারকে।

বলে রাখি তর্ক হবে যৌক্তিক অযৌক্তিক কোনও কিছু হবে না। মহাজোট সরকারে যদি কোনও যুদ্ধাপরাধী থেকে থাকে তাহলে তথ্য সহ নাম উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ রইল।

প্রথমেই ১৯৭১ সালের জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের এপ্রিল মাসের কিছু হেডলাইন,সম্পাদকীয়, মূল খবরের বিশেষ কলাম বলছি।

৮ এপ্রিল:
৭ এপ্রিল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে চলে পাকসেনাদের তান্ডব। অথচ সংগ্রাম এই বিষয়টি হালকা করতে গিয়ে “ভারতীয় অপপ্রচার শিরোণামে” সম্পাদকীয়তে লিখে, “……এমনকি রোকেয়া হলে কিছু হওয়াতো দূরের কথা, শোনা যায় সেখানে কেবল অন্য হল থেকে দু’একটা ছাত্র এসে আশায় নিয়েছিলো” অপর দিকে একজন বিদেশী সাংবাদিক মিচেল লরেন্ট এর মতে, ১০এপ্রিল তিনি এখানে এসে দেখতে পান যে, জনাদশেক ছাত্রকে একসাথে মাটিতে লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আরও অনেককে বিছানায় যেভাবে ঘুমিয়েছিলো, সেভাবেই পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে ছিলো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ছিলো ট্যাংকের মাড়িয়ে যাবার দৃশ্য।

একই দিনে দৈনিক সংগ্রামে “নিজেরে হারায়ে খুঁজি” উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “বাংলাদেশ ইন্দিরা গান্ধীর স্বপ্নের রামরাজ্য” ৮ এপ্রিলের প্রথম পাতায় লিখা হয় “পূর্ব পাকিস্তানের জনগন সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের দেখামাত্র খতম করে দিবে”। জামায়াতের একটি বিবৃতি ৪ কলামের বিশাল পরিসরে দেয়া হয়, যাতে লেখা ছিলো- পূর্ব পাকিস্তানের জনগন দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দিবে না।

৯ এপ্রিল:
“কাশ্মীর থেকে পূর্ব পাকিস্তান” শীর্ষক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, “ হিন্দুস্থান পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য মায়াকান্না কেঁদে ও বন্ধু সেজে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যপক অনুপ্রবেশের কসরত চালিয়ে যাচ্ছে, নেহেরু তনয়া মিসেস গান্ধী মনে করেছেন তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হলে কাশ্মীরের মতো পূর্ব পাকিস্তান দখল করে এখানে হত্যাযজ্ঞ চালাবে।

১০ এপ্রিল:
প্রথম পাতায় পুরো কলামজুড়ে বড় বড় হেডলাইন করে এবং বিশাল ছবি সম্বলিত লে: জে: টিক্কা খানের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়ার সংবাদটি গুরুত্ব সহকারে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে রবীন্দ্রনাথের গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষনা করা হয়। বিষয়টি দৈনিক সংগ্রামের সহ্য হয়নি, তাই তারা “ভারতের মায়াকান্না” উপ-সম্পাদকীয়তে লিখে, “রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে হিন্দু” এর কয়েক সপ্তাহ আগেই ঢাকা ভার্সিটির ‘জিন্নাহ হল’ ‘সূর্যসেন হল’ নাম ধারণ করে।

১১ এপ্রিল:
৭ কলাম ব্যাপী ও ৩ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট বড় বড় হরফে “ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠন” শিরোণামে লেখা হয়, – ঢাকার নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য ১৪০ সদস্য কমিটি বিশিষ্ট নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঠেকানো, এবং কমিটিং প্রথম মিটিং শেষে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। কমিটিতে পূর্বপাকিস্তানের কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা জয়েন উদ্দিনকে আহবায়ক করা হয়। বাকিরা হলেন, জনাব এ কে এম শফিকুল ইসলাম, মৌলানা ফরিদ আহমদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, পীর মহসেন উদ্দিন, মুহম্মদ আলী, এ এস এম সোলায়মান, আবুল কাশেম, আতাউল হক খান। অধ্যাপক গোলাম আযমকে কেন সভাপতি করা হয়নি এ নিয়ে বৈঠকে ব্যাপক বাক বিতন্ডতা হয়।

একই দিন “পাক ভারত সম্পর্ক” শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে লিখা হয়, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশের জন্য একটি স্থায়ী, গ্রহনযোগ্য ইসলামী চেতনা ও আদর্শ সম্বলিত শাসন ব্যবস্থা দেয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট আছেন। তিনি তার ৫ দফা আইন কাঠামোর আদেশে পাকিস্তানের ঐক্য ও ইসলামী আদর্শের পুরোপুরি বজায় রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন। গত নির্বাচনের পরের কাহিনী বড়ই নাজুক। কিছু ব্যক্তি তাদের ঐক্য বজায় রাখার নির্বাচনী ওয়াদার খেলাপ করে এখন বিপ্লবের কথা বলছে, যা আমাদের জন্য দু:খজনক। এই সুযোগে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখলের পাঁয়তারা করছে। যা পাকিস্তানবাসী কোনদিনই হতে দিবে না।”

১২ এপ্রিল
“করাচি বিমান বন্দরে আটককৃত শেখ মুজিব” ক্যাপশনে চারকলাম সমান জায়গা জুড়ে একটি ছবি এ দিন ছাপা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এ দেশের জনগন শেখমুজিবকে মুক্ত অবস্থায় দেখতে চেয়েছিল। এর নিরিখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন স্টপ গ্যাপে সর্বক্ষণ প্রচার করতো, “শেখমুজিব আমাদের মাঝে আছেন এবং থাকবেন।” কিন্তু এইদিনের দৈনিক সংবাদের খবরে দেশের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। জনরোষ বেড়ে যায় কয়েকগুন। দৈনিক সংগ্রাম চেয়েছিল পাঁচপোড়ন নিউজ করে বাংলাদেশীদের মনোবল ভাঙতে, কিন্তু মনের বলতো ভাঙ্গেইনি বরং বেড়েছিলো কুন্ডলাগ্নির মতো।

একই দিন চতুর্থ পাতায় অস্ত্রসহ দুই যুবকের ছবি ছাপা হয় এবং সংবাদে লিখা হয়, “গত শনিবার যশোহরের বেনাপোল সীমান্তে দুই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী গ্রেফতার”। কিন্তু ছবির দুই যুবকের ছবি ছিলো অস্পষ্ট। এরা দুজন যে আটককৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলো তাতে কোন সন্দেহ নেই। যেহেতু তারা এদেশের সন্তান তাই তাদেরকে কেউ চিনে ফেলবে এই ভয়ে ছবি অস্পষ্ট করে ফেলা হয়।

এদিন পত্রিকার এডিটোরিয়ালে গোলাম আযমের একটি বেতার ভাষন খুব গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়। যার সারমর্ম হচ্ছে “ ভারত পূর্ব পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে মূলত পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগনকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সামনে পাঠিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে দাসে পরিণত করতে চায়।

“অর্থনৈতিক পূনর্গঠন” শিরোনামে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, গতমাসের সকল হিংসাত্মক, ধ্বংসাত্মক হানাহানিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে যারা শহর ত্যাগ করেছিলো তারা আবার শহরে ফিরে আসতে শুরু করেছে। এমনকি যারা প্রদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো তারা আবার প্রদেশে ফিরে আসছে। এতে করে বুঝা যায় পূর্ব পাকিস্তানে পরিপূর্ণ শান্তি বিরাজ করছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র জনগনের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রয়েছে। দেশ এখন শান্তি শৃঙ্খলার দিকে উত্তরণ করছে।

“শান্তি কমিটি গঠন একটি শুভ উদ্যোগ” শিরোণামে একটি বিশেষ প্রবন্ধে লেখা হয়, দেশের শান্তি শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন, ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঠেকানো ও পঞ্চমবাহিনীর জঙ্গী তৎপরতা বন্ধে শান্তি কমিটি একটি বিরাট ভূমিকা রাখবে। ঢাকা শহরের মতো দেশের প্রতিটি শহরে এরকম কমিটি গঠন করা হলে পাকিস্তানের সার্ভভৌমত্ব অক্ষুন্ন থাকার ব্যাপারে আর কোন ঝুঁকি থাকবে না।

১৩ এপ্রিল
“পাকিস্তানের প্রতি চীনের দৃঢ় সমর্থন” শিরোণামে পুরো ৮ কলাম জুড়ে বড় বড় হরফে প্রথম পাতায় বিশাল নিউজ করা হয়।
শান্তি কমিটি গঠন করার পর প্রথম মিছিলটি ঢাকায় ১২এপ্রিল বের করা হয়। যার নেতৃত্বে ছিলো ইতিহাসের নিকৃষ্ট কীট গোলাম আযম এবং জনধিকৃত রাজাকার নিজামী। মতিউর রহমান নিজামী তখন ইসলামী ছাত্র সংঘের শীর্ষনেতা। এই মিছিলের খবর দৈনিক সংগ্রাম ৫কলাম ব্যাপী ছবি সহকারে খুব ফলাও করে ছাপে। মিছিলের শ্লোগান ছিলো , “পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়েদে আযম জিন্দাবাদ” “পাকিস্তানের উৎস কি- লাইলাহা ইল্লাল্লাহ” “মিথ্যা প্রচার বন্ধ কর” ব্রাক্ষ্মবাদ নিন্দাবাদ, সাম্রায্যবাদ মূর্দাবাদ”। মিছিলের খবরে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়, জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান ও ইয়াহিয়ার বড় বড় ছবি মিছিলে শোভাপায়। শান্তি কমিটির মিছিল শেষে গোলাম আযম যে মোনাযাত করেন তার কভারেজ দিতে গিয়ে লেখা হয়, “পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে দেশ রক্ষার জন্য আরও বেশি শক্তিদানের জন্য গোলাম আযমের নেতৃত্বে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ পাকিস্তানী আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন।”

১৪ এপ্রিল
“ফ্যাসিবাদী ভারতের স্বরূপ” শিরোণামে উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “জয় বাংলা আন্দোলন বানচাল হয়ে যাওয়ায় দেশে এখন সু’দিন ফিরে এসেছে। এতে করে ফ্যাসিবাদী ভারতের সকল অপপ্রচার নস্যাৎ হয়ে গেছে।”

একই দিন পত্রিকায় জাতিসংঘের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। নিরপরাধ বাংলাদেশীদের জন্য সহমর্মিতা জানাতে গিয়ে জাতিসংঘকে সঙগ্রামের মতো একটি পত্রিকার কট্টুছাগুরাম সম্পাদকের সমালোচনা হজম করতে হয়। ১৯৭১ সালে চীন ছিলো জাতিসংঘ বহির্ভুত একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র। দৈনিক সংগ্রাম তীব্র কম্যুনিস্ট বিরোধী হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র একাত্তরে পাকিস্তানকে সমর্থন দানের কারণে চীনের শাসন ব্যবস্থার প্রশংসায় গদগদ করেছিলো। “চীনের সমর্থন” শিরোনামে ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে পাকিস্তানকে সমর্থন করায় চীনের বাহুল্য প্রশংসা করা হয়। অপরদিকে নিধনযজ্ঞে পাকিস্তানকে সমর্থন না দেওয়ার কারণে জাতিসংঘের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের সমালোচনা করতে গিয়ে লেখা হয়, “ চীন নয় বরং জাতিসংঘেরই উচিত ছিলো পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করা এবং সামরিকভাবে পাকিস্তানকে সাহায্য করা। জাতিসংঘের এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে বিশ্বে এখন অহেতুক বিপ্লবের জন্ম নিবে এবং এত করে ভারতের মতো নব্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সমূহ সোৎসাহে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য করে যাবে।”

১৫ এপ্রিল
দৈনিক সংগ্রাম তার প্রতিটি সংবাদে বোঝাতে চাইতো দেশে পূর্ণাঙ্গ শান্তি বিরাজ করছে। এবং দেশের চলমান জঙ্গী তৎপরতা খুবই সীমিত। কিন্তু ১৫ এপ্রিল “ঢাকা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত বিশাল এলাকা দুষ্কৃতিকারী মুক্ত” শিরোনামে থলের বিড়ালটি বেরিয়ে আসে। এতে প্রতীয়মান হয় দেশে মোটেও শান্তি নেই এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী কথিত অশান্তি রোধে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালাচ্ছে। নইলে “দুষ্কৃতিকারী মুক্ত” শব্দের উৎপত্তি হয় কিভাবে? ছাগল হারিয়ে বৌকে মা এবং ছেলেকে বাপ ঢাকার মতো অবস্থায় ছিলো দৈনিক সংগ্রাম। কখনও বলতো দেশে পরিপূর্র্ণ শান্তি বিরাজ করছে আবার কখনও বলতো ভারতের ইন্ধনে দেশে বাংলাদেশীরা বিশৃঙ্খলা করে শান্তি বিনষ্ট করছে।

১৫ এপ্রিলেই প্রথম পাকিস্তানের বিমান হামলার কথা স্বীকার করা হয়। খবরে বলা হয় “ এ পর্যন্ত সংগঠিত সকল বিমান আক্রমনের উদ্দেশ্য ছিলো ভারতীয় অনুপ্রবেশ কারীদের রুখে দেয়ার জন্য এবং জঙ্গী দমনে।

১৬ এপ্রিল
“জনতা পাকিস্তান চায়” শিরোনামে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দভূমি বানানোর ভারতের চরম ষড়যন্ত্রের জবাব দিবে পাকিস্তানের জনগন। জনগন পাকিস্তানকে পাকিস্তান রূপেই দেখতে চায়।” জনগনের নাম বিক্রি করে দৈনিক সংগ্রাম সবসময় এধরণের সংবাদ ছাপতো। অথচ তারা এও জানতো যে, তখন প্রতিদিন যে হারে দৈনিক সংগ্রাম পোড়ানো হতো তাতে এক পরিবারের ৫ বছরের রান্নার লাড়কির যোগান হয়ে যেত।

১৭ এপ্রিল
শান্তি কমিটির করা মিছিলের ভূয়সী প্রসংশা করে এ দিনও বেশ কয়টি রিপোর্ট করা হয়। এমনই একটি রিপোর্টে বলা হয় “ পাকিস্তান রক্ষার সংগ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি কমিটি গঠনের পর পুরো পূর্ব পাকিস্তানের জনগন এখন একই পতাকাতলে ঝড়ো হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগন ফুঁসে উঠেছে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে।” বস্তুত দৈনিক সংবাদ অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব সংবাদ প্রকাশ করে বাংলাদেশের জনগনকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাতো।

একই দিন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে এরকম শান্তি কমিটি গঠনের জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগকে আহবান জানানো হয়। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মোট ৩৭ বার জিহাদ এবং মুজাহিদ শব্দটি উল্লেখ করা হয়।দৈনিক সংগ্রাম একাত্তরে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতকে বল্লম এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো। যদিও বাংলাদেশীরা প্রমান করেছিলো, বাংলাদেশীরা বাস্তবিক অর্থেই শত্রু সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। যেমন আজ এই ২০০৮ সনে এসে কি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সোচ্ছার নই?

১৮ এপ্রিল
“শেখ মুজিবের রেফারেন্ডম ছিলো স্বায়ত্বশাসন, স্বাধীনতা নয়” বোল্ড হরফে বড়সড় একটা আর্টিকেল লেখা হয় উপ-সম্পাদকীয়তে। যেখানে শেখ মুজিবের নামে কল্পনা প্রসূত সব অবাস্তব এবং অবান্তর কথা লেখা হয়। বলা হয়, “শেখ মুজিব সত্যিকার অর্থের ভারতীয় দালাল এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠীর ক্ষমতা লোলুপ এজেন্ট। দেশের জনগনকে মুক্তির কথা বলে অত্যুক্তির বুলি শিখিয়ে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখার এক অভিনব নকশা তৈরী করেছে ভারতের দালালেরা। বাংলাদেশের জনগন এখন ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরকে দেখতে পাচ্ছে। মুজিবকে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্র দেখে মনে হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্যিকারের ঘটনা ছিলো।”

১৯ এপ্রিল
১৮ এপ্রিল ঢাকাতে জয়বাংলা শ্লোগানে বিশাল এক মিছিল বের করে মুক্তি কামী জনগন। যেখানে জয়বাংলা লেখা খচিত লাল সবুজ পতাকা বহন করা হয় এবং কাযেদে আজমের ছবি পদদলিত করা হয় এবং পোড়ানো হয়। এ ঘটনার পরেই দৈনিক সংগ্রামের খবর প্রকাশের ধারা পাল্টে যায়। কারণ, বিদেশী মিডিয়া এই মিছিলের বেশ কভারেজ দেয়। ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রায় সব খবরের মর্মার্থ ছিলো, “পুরো পূর্ব পাকিস্তান ভারতীয় অনুপ্রবেশে ভরে গেছে। পথে পথে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারত থেকে লোক আনিয়ে মছিল করানো হয়েছে ঢাকার পথে পথে।” পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় “ সময় এসেছে নড়েছড়ে বসার। পুরো পাকিস্তানকে ভারতীয় চর মুক্ত করতে হবে।”

২০ এপ্রিল
“জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগ আগেই সতর্ক করে আসছিলো” নামের উপসম্পাদকীয়তে উল্লেখিত দল সমূহের আগাম সতর্কবাণী সম্পর্কে একটি হায়! হায়!! লেখা ছাপা হয়।
প্রাক নির্বাচনী সতর্কবাণীর বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, “জামায়াত এবং মুসলিম লীগ নির্বাচনের আগেই ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জনগনকে সতর্ক করে আসছিলো। কিন্তু জনগন তাতে কান দেয়নি। এখন কেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সামনে এমনভাবে কাতরাচ্ছে? দু’শ বছর ব্রিটিশ শাসনে থেকেও জনগন ভাবতে পারেনি যে, এই পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবের মতো আরো এক মীরজাফরের জন্ম হয়েছে। এই মূহুর্তে পূর্ব পাকিস্তানের উচিত হবে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং দেশীয় দালাল, মীরজাফরদের ধরে ধরে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া। আমরা গত পহেলা মার্চ থেকে তাদের জয় বাংলা শ্লোগান শুনতেছি এবং তাদের লুন্ঠন, অত্যাচার, রাহাজানি স্বচক্ষে দেখতেছি”

২১ এপ্রিল
এদিন সম্পাদকীয়তে বেশ জোরালো ভাবে বাংলাদেশীদের ধ্বংসের পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আহবান জানানো হয়। “প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সেনাবাহিনীকে ছড়িয়ে দেয়ার সময় এসেছে” টাইটেলে শক্তভাবে এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে লেখা হয় “ একটি দেশ জন্ম নিতে এবং পরাধীনতা স্বাধীন হতে কয়েকশ বছর লেগে যায়, কিন্তু সে দেশ পরাধীন হতে যেন একদিনও লাগে না। ব্রিটিশরা বিদায় নেয়ার পর এখন নতুন করে ভারতীয়রা চাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে তাদের দাস বানাতে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগন অধিক পরিশ্রমী এবং মেধাবী। আমাদের আছে সুদক্ষ সেনাবাহিনী। তারা এবার ছড়িয়ে পড়ুক পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে তাদেরকে সাহায্য করবে এ প্রদেশের দেশপ্রেমিক জনগন।”

সুত্র: মুক্তিসেনা ব্লগস্পট সাইট।

এবার বলছি সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম প্রকাশিত প্রথম তালিকার ৫০জন যুদ্ধাপরাধীর নাম !
১. গোলাম আযম (জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর)
২. মতিউর রহমান নিজামী (বর্তমান আমীর, জামাত)
৩. আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (সেক্রেটারি জেনারেল, জামাত)
৪. মো. কামারুজ্জামান (সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল )
৫. খুলনার মওলানা এ কে এম ইউসুফ
৬. পিরোজপুরের দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী
৭. বরিশালের মওলানা আব্দুর রহিম
৮. জামায়াতের সাবেক সিনিয়র নায়েবে আমীর আব্বাস আলী খান (মৃত),
৯. ঢাকার মীরপুরের আব্দুল কাদের মোল্লা,
১০. নোয়াখালীর মো. হামিদুল হক চৌধুরী,
১১. ঢাকার খাজা খায়রুদ্দিন,
১২. সিলেটের মাহামুদ আলী,
১৩. বগুড়ার মো. আবদুল আলীম,
১৪. ঢাকার এ এম এস সোলায়মান,
১৫. চট্টগ্রামের সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী,
১৬. ফজলুল কাদের চৌধুরী (চট্রগ্রাম)
১৭. ময়মনসিংহের জুলমত আলী খান,
১৮. রংপুরের কাজী কাদের,
১৯. খুলনার খান আবদুস সবুর খান,
২০. মওলানা ফরিদ আহমেদ,
২১. কুষ্টিয়ার শাহ মো. আজিজুর রহমান,
২২. কুমিল্লার মাওলানা আব্দুল মান্নান,
২৩. মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবু মোতালেব মালেক
২৪. সে সময় ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মো. ইউনুস,
২৫. কুমিল্লার এ বি এম খালেক মজুমদার,
২৬. সিলেটের এ এন এম ইউসুফ,
২৭. ময়মনসিংহের নুরুল আমিন,
২৮. কুমিল্লার এ কিউ এম শফিউল ইসলাম,
২৯. পাবনার আবদুল মতিন,
৩০. রাজশাহীর অ্যাডভোকেট মো. আইনুদ্দিন,
৩১. মাওলানা নুরুজ্জামান (আইআরপি)।
৩২. পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী মাওলানা মো. ইসহাক,
৩৩. নওয়াজেস আহমেদ,
৩৪. মো. আকতার উদ্দিন আহমেদ,
৩৫.নোয়াখালির গোলাম সরোয়ার,
৩৬. পাবনার মাওলানা আবদুস সোবহান,
৩৭.. টাঙ্গাইলের আব্দুল বাছেদ,
৩৮. ময়মনসিংহের আব্দুল মতিন ভূঁইয়া,
৩৯. রংপুরের মো. আবদুল কাশেম,
৪০. নোয়াখালির ওবায়দুল্লাহ মজুমদার,
৪১. চট্টগ্রামের মীর কাশেম আলী,
৪২. বরিশালের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার,
৪৩. ফরিদপুরের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ,
৪৪. ময়মনসিংহের মো. আবদুল হান্নান,
৪৫. পাবনার ব্যারিস্টার কোরবান আলী,
৪৬. জামালপুরের আশরাফ হোসাইন,
৪৭.খুলনার অ্যাডভোকেট আনসার আলী,
৪৮. সিলেটের মো. কায়সার,
৪৯. বগুড়ার আবদুল মজিদ তালুকদার, ও
৫০. ময়মনসিংহের এ কে মোশাররফ হোসেন।
যুদ্ধাপরাধীদের ঠিকানার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জেলার বিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে

তথ্য সুত্র: মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম।

This item has been recorded here as part of ICSF's Media Archive Project which is a crowd sourced initiative run by volunteers, a not for profit undertaking to facilitate education and research. The objective of this project is to archive media items generated by different media outlets from around the world - specifically on 1971, and the justice process at the International Crimes Tribunal of Bangladesh. This archive also records items that contain information on commission, investigation and prosecution of international crimes around the world generally. Individuals or parties interested to use content recorded in this archive for purposes that may involve commercial gain or profit are strongly advised to directly contact the platform or institution where the content is originally sourced.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Facebook Comments

comments

Archive I: Media Archive

Archives news reports, opinions, editorials published in different media outlets from around the world on 1971, International Crimes Tribunal and the justice process.

Archive II: ICT Documentation

For the sake of ICT’s legacy this documentation project archives, and preserves proceeding-documents, e.g., judgments, orders, petitions, timelines.

Archive III: E-Library

Brings at fingertips academic materials in the areas of law, politics, and history to facilitate serious research on 1971, Bangladesh, ICT and international justice.

Archive IV: Memories

This archive records from memory the nine-month history of 1971 as experienced and perceived by individuals from all walks of life.

Partners

Website Sections

External Resources

Tools

About Us

Follow Us