TwitterFacebook

আলবদর ক্যাম্পের পাহারাদার মোহন মুন্সীর জবানবন্দি : তিনজনকে দাঁড় করিয়ে গুলি করেন কামারুজ্জামান

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল বুধবার জবানবন্দি দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর বাহিনীর সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন খান ওরফে মোহন মুন্সী। একাত্তরে তিনি শেরপুরের একটি আলবদর ক্যাম্পের পাহারাদার ছিলেন। জবানবন্দিতে তিনি ওই সময়ের হত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনার বিবরণ দেন, যেসবের সঙ্গে কামারুজ্জামানের সম্পৃক্ততা ছিল।
বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে গতকাল রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী মোহন মুন্সীর জবানবন্দি নেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এ কে এম সাইফুল ইসলাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা জবানবন্দির সময় কামারুজ্জামান আসামির কাঠগড়ায় ছিলেন।
জবানবন্দিতে মোহন মুন্সী বলেন, একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল ২২-২৩ বছর। সে সময় তিনি নানার দর্জির দোকানের কাজ ছেড়ে স্বেচ্ছাসেবকের প্রশিক্ষণ নেন। প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে শেরপুর কলেজ মাঠে প্রশিক্ষণ হতো। তিনি তিন মাস প্রশিক্ষণ নেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ১৫-২০ দিন আগে তা শেষ হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থানার দারোগারা স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অফিস, ব্যাংক, সেতু ইত্যাদি পাহারার কাজে নিয়োগ দেয়।
জবানবন্দির শুরুর দিকে শেরপুরে সুরেন্দ্রমোহন সাহার বাড়িতে আলবদর ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার বিবরণ দেন মোহন মুন্সী। জবানবন্দি অনুসারে, কামারুজ্জামান নয় আনি বাড়ি এবং জি কে স্কুলেও সেনাদের দুটি ক্যাম্প করে দেন। ক্যাম্প করে দেওয়ার পরে কামারুজ্জামান বদর বাহিনীর বড় নেতা হন, তাঁর সহযোগী ছিলেন কামরান নামের একজন। রাজাকার বাহিনীতে লোক নেওয়ার জন্য কামারুজ্জামান মাইকে ঘোষণা দেন। ময়মনসিংহ, জামালপুর, নকলা, নালিতাবাড়ী, সোহাগপুর, আহম্মদনগর, কাটাখালী, শ্রীবরদী, ভাগেলানগর, বক্সীগঞ্জ, ঝগড়ারচর—এসব জায়গায় ক্যাম্প ছিল। কামারুজ্জামান যেসব জায়গায় ক্যাম্প করতে বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর রিয়াজ ও মেজর আইয়ুব সেসব জায়গায় ক্যাম্প করেন। ওই ক্যাম্পগুলোতে পাকিস্তানি সেনারা ও আলবদর বাহিনীর লোকজন থাকত।
জবানবন্দির পরবর্তী পর্যায়ে মোহন মুন্সী বিবরণ দেন, কীভাবে তাঁকে সুরেন্দ্রমোহন সাহার বাড়ির আলবদর ক্যাম্পের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জবানবন্দি অনুসারে, মোহন মুন্সীর বাড়ি সুরেন্দ্রমোহন সাহার বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় আলবদররা জোর করে ক্যাম্পে নিয়ে আসে। পরে তাঁকে সুরেন সাহার বাড়ির ক্যাম্পের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বলেন, ওই ক্যাম্পে যাওয়ার দুই দিন পর তিনি কামারুজ্জামান, কামরানসহ আরও দু-তিনজনের মধ্যে কথাবার্তা শোনেন। তাঁরা হান্নান প্রিন্সিপালের (শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নান) মাথা মুড়ে চুনকালি মাখিয়ে শহরে ঘোরানোর কথা বলাবলি করছিলেন। পরে হবিবর উকিলের বাসায় হান্নান প্রিন্সিপালকে নিয়ে গিয়ে সেখানে তাঁর মাথার চুল ন্যাড়া করে, চুনকালি মাখিয়ে ও কোমরে দড়ি পরিয়ে শহরে ঘোরানো হয়। ক্যাম্পের ফটক থেকে তিনি এসব দেখেছেন। পরে মেজর রিয়াজ ওই ক্যাম্পে গেলে হান্নানকে নিয়ে আসা হয়। তাঁর কোমরের বাঁধন খুলে দিলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়েন। তাঁর মাথায় পানি ঢালা হলে ঘণ্টা খানেক পরে জ্ঞান ফিরে আসে। কামারুজ্জামান, কামরানসহ কয়েকজন আলবদর নেতার উপস্থিতিতে মেজর রিয়াজ বলেন, হান্নান সাহেব শিক্ষিত মানুষ। তাঁর সঙ্গে এমন করা ঠিক হয়নি। পরে হান্নানকে নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেন মেজর রিয়াজ।
মোহন মুন্সী বলেন, পরে ওই ক্যাম্পে খড়খড়িয়ার গোলাম মোস্তফাকে চোখ-মুখ-হাত বেঁধে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে মারধর করা হচ্ছিল। তিনি পানি পান করতে চাইলেও তাঁকে তা দেওয়া হয়নি। তাঁর চাচাসহ কয়েকজন তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে এলেও কোনো কাজ হয়নি। সন্ধ্যার আগে মেজর রিয়াজ এলে কামারুজ্জামান তাঁকে বলেন, আওয়ামী লীগের লোক ধরা পড়েছে। মেজর রিয়াজ বলেন, তিনি আরেকটি ক্যাম্প পরিদর্শন করে তারপর আসবেন। এর মধ্যে আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা নাসির আসেন। তিনি মোস্তফার চোখ বেঁধে রিকশায় করে নিয়ে যান। নাসির আলবদর কার্যালয় থেকে একটি চীনা বন্দুক নিয়ে সেরি ব্রিজে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পর সেখানে কামারুজ্জামান যান। এর আধঘণ্টা পর কামারুজ্জামান ও নাসির ফিরে আসেন এবং একসঙ্গে ক্যাম্পের ওপরতলায় যান। নাসির নিচে এসে বলেন, ‘স্যারের (কামারুজ্জামান) হাত এখন সই হয়েছে, এখন সহজে বন্দুক চালাতে পারে।’
সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেন, পরে কামারুজ্জামান একটি ট্রাকে করে ২০-২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার সঙ্গে নিয়ে নকলার উদ্দেশে রওনা হন। তিনি পরে জানতে পারেন, তাঁরা নুরন্দী ও পিয়ারপুরের মাঝখানের একটি হিন্দু বস্তি থেকে সুশীল নামের একজনকে ধরে নয় আনি ক্যাম্পে রেখেছেন। মেজর রিয়াজের সঙ্গে কথা বলার পর কামারুজ্জামান তাঁকে মুসলমান বানাতে বলেন। সুশীলের নাম রাখা হয় মহিরুদ্দীন খান। তিনি তাঁদের সঙ্গে নামাজও পড়েন। পরে তাঁকে সুরেন সাহার বাড়ির ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সুশীলকে ওই বাড়ির পুকুরে সাঁতার কাটানোর জন্য কামরানকে নির্দেশ দেন কামারুজ্জামান। কিন্তু সাঁতার কাটতে না পারায় সুশীলকে পুকুরপাড়ে রাখা হয়। সুশীলকে পুকুরপাড়ে রাখা নিয়ে কামারুজ্জামানের সঙ্গে নাসির ও কামরানের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কামারুজ্জামান নাসিরের বন্দুক নিয়ে সুশীলকে গুলি করে মেরে ফেলেন।
মোহন মুন্সী বলেন, এরপর কাজল নামের একজনকে মোল্লাপাড়া থেকে ধরে এনে সারা দিন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। কাজলকে শেরপুরে থাকতে নিষেধ করে কামারুজ্জামান তাঁকে ছেড়ে দেন। পরে কাজলের গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য নাসির, কামরানকে বলেন কামারুজ্জামান। বলা হয়, কাজল যদি নদী পার হয়ে জামালপুরে যেতে চায়, তবে নদীতেই তাঁকে শেষ করে দিতে হবে। পরে জানা যায়, কাজলকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি। ওই দিন মেজর রিয়াজ হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হলে তাঁকে নিতে একটি হেলিকপ্টার আসে। ওই সময় কামারুজ্জামান একটি চিঠি দিয়ে কামরানকে বলেন, ‘আমাদের স্যারকে এই চিঠিটা পৌঁছাবা।’ তখন পাশে থাকা জয়নাল বলেন, ‘কোন সারকে দিবে?’ জবাবে কামারুজ্জামান বলেন, ‘তোমার মনে নেই, সেদিন যে টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছিল, সেই স্যার গোলাম আযমের নিকট চিঠিটা পৌঁছায় দিবা।’ এরপর কামরানকে নিয়ে মেজর রিয়াজ হেলিকপ্টারে করে চলে যান। তাঁরা আর ফিরে আসেনি।
মোহন মুন্সী বলেন, ‘একদিন শুনতে পাই কামারুজ্জামানসহ অন্যরা মিটিং করছে। তাঁরা বলেন, ‘সোহাগপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আছে। ওই গ্রামটি ঘেরাও করতে হবে। পরে তাঁরা ওই গ্রামটি ঘেরাও করতে যান। আলবদর বাহিনীর কমান্ডার কামারুজ্জামান সঙ্গে যান। পরদিন সকালে দেখি, ট্রাকে করে অনেকগুলো লাশ নিয়ে আসা হয়েছে। এগুলো পৌরসভা পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মাইকে ঘোষণা করে জানানো হয়, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা মেরে ফেলা হয়েছে। কিছু লাশ আনা হয়েছে। তখন আমার স্যার কামারুজ্জামান আমাকে বলেন, “অপারেশনে গিয়ে ওদের মেরে ফেলেছি। এই অপারেশনে রাজাকাররাও ছিল।”’
মোহন মুন্সী আরও বলেন, তালুকপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধা কাশেমের বাড়ি। তিনি কামারপুর ক্যাম্পের কাছে ধরা পড়েন। তিনি আরও দুজনসহ অভিযানে এসেছিলেন। কাশেমসহ তিনজনকে কামারুজ্জামান দাঁড় করিয়ে গুলি করেন। দুজন মারা গেলেও কাশেম বেঁচে যান। এ ঘটনা তিনি স্বাধীনতার পরে কাশেমের কাছে শুনেছেন।
জবানবন্দি শেষে মোহন মুন্সীকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী কফিল উদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধকালে একজন চিহ্নিত আলবদর ছিলেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মোহন মুন্সী বলেন, ‘আমি এলাকায় একজন চিহ্নিত আলবদর ছিলাম।’ ১৯৯০-এর পর বিএনপি, না আওয়ামী লীগে ভোট দিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আমার বস কামারুজ্জামানকে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়েছি।’ আলবদর ক্যাম্পে চাকরিরত অবস্থায় কত বেতন পেতেন—আইনজীবীর এ প্রশ্নে সাক্ষী বলেন, ‘কোনো বেতন দিত না, ভালো খাবার দিত।’
কফিল উদ্দিন জানতে চান, একাত্তরে কামারুজ্জামানের অবস্থান কী ছিল? জবাবে মোহন মুন্সী বলেন, ‘আমার বস কামারুজ্জামান অনেকের উপরে ছিলেন। তিনি মেজরদের সঙ্গে থাকতেন। সে সময় তিনি যদি মনে করতেন, শেরপুর শহর উড়িয়ে দেবেন, তা-ই করতে পারতেন।’ স্বাধীনতার পরে তাঁর নামে কোনো মামলা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বস কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধেই কোনো মামলা হয়নি। আমি তো পাহারাদার ছিলাম, আমার বিরুদ্ধে আর কী মামলা হবে?’
জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Archive I: Media Archive

Archives news reports, opinions, editorials published in different media outlets from around the world on 1971, International Crimes Tribunal and the justice process.

Archive II: ICT Documentation

For the sake of ICT’s legacy this documentation project archives, and preserves proceeding-documents, e.g., judgments, orders, petitions, timelines.

Archive III: E-Library

Brings at fingertips academic materials in the areas of law, politics, and history to facilitate serious research on 1971, Bangladesh, ICT and international justice.

Archive IV: Memories

This archive records from memory the nine-month history of 1971 as experienced and perceived by individuals from all walks of life.

Partners

Website Sections

External Resources

Tools

About Us

Follow Us