Home » Abdul Quader Molla, Bangla News 24, Bangladesh, Bengali, Dhaka, News, Proceedings before ICT-2, Testimony, Witness

ট্রাইব্যুনালে সপ্তম সাক্ষী: কাদের মোল্লার হাতে রাইফেল ছিল, তিনিও গুলি করেন

8 August 2012 Original Source: Link

ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একাত্তরের ২৫ নভেম্বর কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর গ্রামের গণহত্যায় নেতৃত্ব দেন কাদের মোল্লা। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে কয়েকজন বাঙালি (আলবদর) সেদিন গুলি করে গ্রামের ৬০ জনকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে কাদের মোল্লাও ছিলেন। তার হাতে রাইফেল ছিল। তিনিও গুলি করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘাটারচর গ্রামের সেই গণহত্যার মর্মষ্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সপ্তম সাক্ষী আব্দুল মজিদ পালোয়ান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে-২ উপস্থিত কাদের মোল্লাকে সেদিনকার গণহত্যার নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে সনাক্তও করেছেন।

বুধবার চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে-২ সাক্ষ্য দেন আব্দুল মজিদ পালোয়ান। তাকে সাক্ষ্যদানে সহায়তা করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী। পরে তাকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের আইনজীবী মাত্র দু’টি প্রশ্ন করার পর জেরা আগামী রোববার ১২ আগস্ট পর্যন্ত জেরা মুলতবি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

সাক্ষী তার সাক্ষ্যে বলেন, ‘‘আমার নাম আব্দুল মজিদ পালোয়ান। বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। আমার গ্রামের নাম ঘাটারচর, যা কেরানীগঞ্জ থানার অধীনে। ’৭১ সালে ৫টি মহল্লা নিয়ে ছিল আমাদের গ্রাম।’’

পরে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী জানতে চান যে, আপনাদের গ্রামে কারা বাস করতেন। সাক্ষী বলেন, ‘‘স্বাধীনতার আগে আমাদের গ্রামে আমরা হিন্দু-মুসলিম মিলে বাস করতাম। ১৯৭০-৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে কিছু লোক ছাড়া অধিকাংশ লোকই আওয়ামী লীগ করতেন।’’

সাক্ষী আব্দুল মজিদ পালোয়ান বলেন, ‘‘৭১ সালের ২৫ নভেম্বর ভোর বেলায় আমি গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাই। ঘুম থেকে জেগে আমি বাড়ির বাইরে যাই। গিয়ে দেখি চারদিকে আগুন জ্বলছে। এবং উত্তর দিকে থেকে গুলির আওয়াজ আসছে শুনতে পাই।’’

‘‘তখন আস্তে আস্তে উত্তর দিকে এগোতে থাকি এবং ঘাটারচর স্কুলের মাঠে থামি। তখন ওই গ্রামে ঝোঁপ-ঝাড় ছিল। আমি একটি গাছের আড়ালে লুকাই। দেখতে পাই, পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্যরা লোকজনকে হত্যা করছে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আরো কয়েকজন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা লোক ছিলেন। তারা বাঙালি ও আলবদর। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুল কাদের মোল্লা। পাকিস্তানি বাহিনীর লোকজন হত্যা করলো। কাদের মোল্লার হাতে রাইফেল ছিল। তিনিও গুলি করেন।’’

মজিদ পালোয়ান বলেন, ‘ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত গোলাগুলি এবং হত্যাকাণ্ড চলে। বেলা ১১টার পরে কাদের মোল্লার লোকেরা ওই স্থান ছেড়ে চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পরে আমরা লোকজনকে ডেকে আনি এবং লাশ সনাক্ত করার চেষ্টা করি। হিন্দু-মুসলমান মিলে ওইখানে ৬০ জন লোক শহীদ হন।’

সাক্ষী বলেন, ‘‘লাশ সনাক্ত করার সময় ওই স্থানে কেরানীগঞ্জ থানা মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ খান আসেন। তিনি আসলে পরে তার কাছে ঘটনার বর্ণনা দেই।’’

সাক্ষী বলেন, ‘‘২৫ নভেম্বরের ঘটনার আগের রাতে জয়নাল ডাক্তারের বাড়িতে আব্দুল কাদের মোল্লা মিটিং করেছেন। জয়নাল ডাক্তারের বাড়ি থেকে পূর্বদিকে দুই তিন বাড়ির উত্তরে আমার বাড়ি। ঘটনার দিন ১১টার পরে ওই স্থান ত্যাগ করার পরে জানতে পারি যে, পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়া খাটো লোকটির নাম আব্দুল কাদের মোল্লা।’’

এরপর আসামির ডকে থাকা অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লাকে সনাক্ত করেন সাক্ষী আব্দুল মজিদ পালোয়ান।

সব শেষে গত ২৭ জুন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান সাক্ষী।

পরে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুস সোবহান তরফদার। দু’টি প্রশ্ন করার পর জেরা অসমাপ্ত রেখে আগামী ১২ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।

উল্লেখ্য, আব্দুল মজিদ পালোয়ান ছাড়াও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আরো ৬ জন সাক্ষী এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহম্মেদ খানও একাত্তরের ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লার নেতৃত্বে কেরানীগঞ্জের শহীদনগর গ্রামের বড় ভাওয়াল খান বাড়ি ও ঘাটারচরসহ পাশের আরও দুটি গ্রামের গণহত্যার ঘটনা তুলে ধরে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এই কাদের মোল্লা একাত্তরে তার নৃশংসতার জন্য ‘মিরপুরের জল্লাদ বা কসাই’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

দ্বিতীয় সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মামা বাহিনীর প্রধান ও কমান্ডার শহিদুল হক খান মামা মিরপুর-কেরানীগঞ্জে এই আলবদর কমান্ডারের হত্যা, গণহত্যাসহ নানা যুদ্ধাপরাধের আরো বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন।

চতুর্থ সাক্ষী কবি কাজী রোজি শহীদ বুদ্ধিজীবী কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেন। তিনি কবি মেহেরুন্নেসা ও তার পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডে কাদের মোল্লা সরাসরি জড়িত ছিল বলে সাক্ষ্যে জানান।

৫ম সাক্ষী শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক ও আইনজীবী খন্দকার আবু তালেবের পুত্র সরকারি কর্মকর্তা খন্দকার আবুল আহসান তার পিতাকে নির্যাতন ও হত্যার পেছনে কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরে সাক্ষ্য দেন। একই সঙ্গে তিনি একাত্তরে মিরপুর এলাকায় অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে কাদের মোল্লার নির্যাতন-নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের নানা বিবরণ তুলে ধরেন।

৬ষ্ঠ সাক্ষী সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সাফিউদ্দিন মোল্লা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একাত্তরের ২৪ এপ্রিল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে মিরপুর থানার পল্লবীর আলোকদী গ্রামের গণহত্যার মর্মষ্পর্শী বর্ণনা দেন। তিনি জানান, আলবদর কমান্ডার কাদের মোল্লা আলোকদী গ্রামে নিজের হাতে গুলি করে অসংখ্য মুক্তিকামী বাঙালিকে হত্যা করেছেন।

এছাড়া কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৩য় সাক্ষী হিসেবে তার হাতে ক্ষতিগ্রস্ত এক নারী সাক্ষী রুদ্ধদ্বার কক্ষে গোপন সাক্ষ্য (ক্যামেরা ট্রায়াল) দেন। আরো একজন নারী সাক্ষীরও রুদ্ধদ্বার কক্ষে গোপন সাক্ষ্য (ক্যামেরা ট্রায়াল) দেওয়ার কথা রয়েছে খুব শিগগিরই।

গত ২৮ মে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ষড়যন্ত্র ও উস্কানিসহ ৬টি অভিযোগ এনে কাদের মোল্লার বিরদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৩(১), ৩(২)(এ)(এইচ) অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২০ জুন তার বিরুদ্ধে ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী ও সুলতান মাহমুদ। তারা ৯৬ পৃষ্ঠার এ সূচনা বক্তব্যে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, কবি মেহেরুন্নেছাসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা, পল্লবীর আলোকদি গ্রামে ৩৪৪ জনকে হত্যা, খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা, বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবসহ সাত জনকে হত্যা, কেরানীগঞ্জের শহীদনগর গ্রামের ভাওয়াল খান বাড়ি ও খাটারচরসহ পাশের আরো দু’টি গ্রামের অসংখ্য লোককে হত্যার ঘটনা।

মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলাটি করেছিলেন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী মোস্তফার কমান্ডার মোজাফফর আহমেদ খান। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয় কাদের মোল্লাসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে। ওই মামলার অভিযোগে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়।

আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত বছরের ১ নভেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। ২৮ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ১৬ এপ্রিল আব্দুল কাদের মোল্লার মামলাসহ তিনটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করার পর গ্রেফতারকৃত বিএনপি-জামায়াতের ৯ নেতার মধ্যে মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। বর্তমানে কাদের মোল্লা ছাড়াও জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। তারা ছাড়াও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের অভিযোগ গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উপস্থাপন করেছেন এবং ২৬ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।

এছাড়া গ্রেফতারকৃত জামায়াতের কর্মপরিষদ ও নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গত ৫ জুলাই তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত সংস্থার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের কথা রয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের সাবেক রোকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-২ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও তিনি পালিয়ে দেশত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়েছে এবং তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একমাত্র বিএনপি নেতা আবদুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে থাকলেও অন্যরা কারাগারে আটক আছেন। তবে অসুস্থতার কারণে গোলাম আযম বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ও সাঈদী বারডেম হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন।

বাংলাদেশ সময়: ১৫০০ ঘণ্টা, আগস্ট ০৮, ২০১২
জেপি/সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

Keywords/

Added by: Khan Muhammad

Leave your response!

Add your comment below, or trackback from your own site. You can also subscribe to these comments via RSS.

Be nice. Keep it clean. Stay on topic. No spam.

You can use these tags:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

This is a Gravatar-enabled weblog. To get your own globally-recognized-avatar, please register at Gravatar.