১৬ বুদ্ধিজীবীর ঘাতক মাঈনুদ্দিন-আশরাফুজ্জামান
ঢাকা: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম দুই খলনায়ক আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিন। এ দু`জনের বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ বিচারে গঠিত দু’টি ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত ও পালিয়ে থাকা জামায়াত-বিএনপির ১০ বর্তমান ও সাবেক নেতার মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি ১ জনের বিরুদ্ধে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং আগামী রোববার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
১১ ও ১২তম ব্যক্তি হিসেবে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্ত কাজ শেষ হয়েছে বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা আতাউর রহমান ও শাজাহান কবির।
তারা জানান, আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে মোট ১৬ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার সরাসরি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রসিকিউশনের মাধ্যমে এ তদন্ত প্রতিবেদন (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নিলেই বিদেশে থাকা এ দুই আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরু হবে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন সূত্র।
তদন্ত কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই বুদ্ধিজীবী হত্যার দুই খলনায়ক আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে দাখিল করা হবে।
তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কাজ শেষ হয়েছে। এখন কাগজপত্র তৈরির কাজ চলছে। ঈদের পরই চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। একই সঙ্গে তাদের গ্রেফতারের আবেদনও জানানো হবে।
তদন্ত সংস্থার এ তদন্ত কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ফজলে রাব্বী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, সেলিনা পারভীন ও সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনসহ ১৬জন বুদ্ধিজীবীকে সরাসরি হত্যার অভিযোগ আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে আমরা পেয়েছি।’’
তিনি বলেন ,গোপালগঞ্জ, ফেনী, চুয়াডাঙ্গা ও ঢাকা শহরের বিভিন্ন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে। এসব এলাকায় তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’’
আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ৪৮ জন সাক্ষী পাওয়া গিয়েছে বলেও জানান দুই তদন্ত কর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, একাত্তর সালে দেশকে মেধাশূন্য করার যে নীল নকশা করেছিলো জেনারেল রাও ফরমান আলী, মাইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান সে পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন করেছিলেন।
একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম দুই খলনায়ক আশরাফুজ্জামান খান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন। স্বাধীনতার পরপরই পালিয়ে যান তারা।
তাদের ফিরিয়ে আনতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বলেন, “দেশের বাইরে যারা পালিয়ে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ড ছাড়া অন্য কোনো দেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।“
তবে হান্নান খান বলেন, “ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তদন্ত সংস্থার নয়। এ ব্যাপারে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।“
নিউইয়র্কে বসবাসরত আশরাফুজ্জামান খান ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার (আইসিএনএ) প্রধান। তিনি একাত্তরে ইসলামী ছাত্রসংঘের (পরবর্তীকালে ছাত্রশিবির) কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি অধুনালুপ্ত দৈনিক `পূর্বদেশ` পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে আশরাফুজ্জামান খানকে জামায়াত ও আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
স্বাধীনতার পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করেন। একাত্তরের শেষ দিকে আশরাফুজ্জামান খানের ৩৫০ নাখালপাড়ার বাড়িতে পাওয়া ব্যক্তিগত ডায়েরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার নাম লেখা ছিল। তাদের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছিল।
চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকার অনেক বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা-নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। তিনি `পূর্বদেশ` পত্রিকায় কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেন। মাঈনুদ্দিন এখন পূর্ব লন্ডন মসজিদের ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থা মুসলিম এইডের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করার পর গ্রেফতারকৃত ও পালিয়ে থাকা বিএনপি-জামায়াতের ৯ নেতার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা। ৮টি তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল এবং তাদের মধ্যে মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
বর্তমানে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। তারা ছাড়াও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উপস্থাপন করেছেন। ২৬ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের সাবেক রোকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-২ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেও তিনি পালিয়ে দেশত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়েছে এবং তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে।
এছাড়া জামায়াতের কর্মপরিষদ ও নির্বাহী কমিটির সদস্য গ্রেফতারকৃত মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গত ৫ জুলাই তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী রোববার ১২ আগস্ট তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিলের কথা রয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একমাত্র বিএনপি নেতা আবদুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে থাকলেও অন্যরা কারাগারে আটক আছেন। তবে অসুস্থতার কারণে গোলাম আযম বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন।
বাংলাদেশ সময়: ১৩১৪ ঘণ্টা, আগস্ট ০৯, ২০১২
জেপি/সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com
Keywords/









Leave your response!